চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬ ১০:৫৭ এএম
‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ৬ মাস' শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন চট্টগ্রামের ডিসি মো. জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
কোন জেলা প্রশাসক এভাবে খুবেকটা সাংবাদিকদের সামনে আসেননি। তার ব্যতিক্রম চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্তিতে শুধু নিজের কর্মকাণ্ড তুলে ধরেননি। দায়িত্ব পালনে নানা প্রতিকূলতা, চ্যালেঞ্জের বিষয় সাংবাদিকদের অবগত করার পাশাপাশি চট্টগ্রামের মানুষ প্রশাসনের কাছে কী চায়? কোথায় ঘাটতি? আর কি কি উদ্যোগ নিলে জনসেবাকে আরও কার্যকর করা যায়? তাও জানতে চেয়েছেন প্রকাশ্যে।
জাতীয় নির্বাচন, জঙ্গল সলিমপুর, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে মানবিক উদ্যোগ—গত ছয় মাসের অভিজ্ঞতা, চ্যালেঞ্জ ও কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বুধবার (২০ মে) দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস সম্মেলন কক্ষে ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ৬ মাস' শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এসব তথ্য-উপাত্ত জানান ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এর আগে গতবছরের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে গত ছয় মাসে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। সেখানে মানবিক উদ্যোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক আয়োজন, সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি এবং গণশুনানি কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক স্থান পায়।
ভিডিওচিত্রে দেখানো হয়, ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জের মধ্যেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। নির্বাচন সামনে রেখে জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে বিস্তৃত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।
জেলা প্রশাসকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ভিডিওচিত্রে নির্বাচনকে ‘অভিযোগহীন ও হতাহতবিহীন’হিসেবে তুলে ধরা হয়।
নির্বাচনের পাশাপাশি আলোচনায় আসে জঙ্গল সলিমপুরে পরিচালিত অভিযানও। দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব ও অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই এলাকাকে সংবাদ সম্মেলনে ‘রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে কোনো প্রাণহানি ছাড়াই এলাকা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে পরিকল্পিত ভূমি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা হয়।
এছাড়া ডিসি পার্কে ফুল উৎসব, ডিসি হিলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন এবং ঈদুল আজহা উপলক্ষে ‘ফেস্টিভ সেল’ চালুর উদ্যোগও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
এছাড়া গত ছয় মাসে ভূমি উদ্ধার, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নেওয়া উদ্যোগ, শ্রমিক অধিকার, ফ্যামিলি কার্ড, খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, সংস্কৃতি চর্চা, কারাগারে মানবিক উদ্যোগ এবং প্রবাসীদের জন্য অনলাইন গণশুনানির মতো কার্যক্রমও পরিচালিত হয়েছে বলে জানানো হয়।
তবে সংবাদ সম্মেলনের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে জেলা প্রশাসকের আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য এবং গণমাধ্যমের কাছে সরাসরি মতামত চাওয়ার উদ্যোগ।
মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, জেলা প্রশাসক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এই জেলার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছেন কি না, কিংবা আরও কী করণীয় রয়েছে, সেটি জানতেই সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করা গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে এসেছেন।
তিনি বলেন, ‘এই দায়িত্বশীল জায়গায় মানুষের প্রত্যাশা পূরণে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ রয়েছে। সমাজের বাস্তব চিত্র সবচেয়ে বেশি তুলে ধরেন গণমাধ্যমকর্মীরা। তাঁদের পরামর্শ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’
নিজের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক মানুষের মাঝেই কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে, আমিও মানুষ হিসেবে তার ব্যতিক্রম নই। তবে আমরা যে দায়িত্বে থাকি, সেই জায়গায় শতভাগ উজাড় করে দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করি।’
জেলা প্রশাসক বলেন, কাজের পরিধি যেমন বাড়ছে, তেমনি সক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এরপরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে নাগরিকদের চাহিদা পূরণে জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক গোলাম মাঈনউদ্দিন হাসান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হকসহ জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।