খুমেক হাসপাতাল
মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ ১৪:৩২ পিএম
আপডেট : ২০ মে ২০২৬ ১৭:১৯ পিএম
চিকিৎসার আশ্রয়স্থল সেই হাসপাতাল থেকেই নাসরিনকে ফিরতে হলো লাশ হয়ে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। হাসপাতালের করিডোরে ছিল স্বাভাবিক নীরবতা। কোথাও রোগীর স্বজনের ক্লান্ত চোখ, কোথাও চিকিৎসার অপেক্ষায় উদ্বিগ্ন মুখ। ঠিক এমন সময় হঠাৎ এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের ইমারজেন্সি অপারেশন থিয়েটার (ওটি) এলাকা। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া ও আতঙ্ক। প্রাণ বাঁচাতে সবাই এদিক-সেদিক ছুটিতে থাকে। আর এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই থেমে যায় এক তরুণীর জীবনসংগ্রাম।
ওই তরুণীর নাম নাসরিন নাহার। তিনি খুলনার কয়রা উপজেলার নেছার আলির কন্যা। পরিবার জানায়, জন্মগত ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। উন্নত চিকিৎসার আশায় গত রবিবার তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তিনি লড়ছিলেন অসুস্থতার সঙ্গে, আর পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করছিলেন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার দিনের। কিন্তু বুধবার ভোরের আগুন সবকিছু বদলে দেয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভোর সাড়ে ৫টার কিছু পর ইমারজেন্সি ওটির ভেতর থেকে বিস্ফোরণের শব্দ আসে। মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো হাসপাতালে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন, আগুন চিৎকারে চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে। রোগী, স্বজন, নার্স ও হাসপাতালকর্মীরা যে যেভাবে পারেন, নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ বিছানায় শুয়ে থাকা রোগী টেনে নামাচ্ছেন, কেউ কোলে শিশু নিয়ে দৌড়াচ্ছেন, কেউ বৃদ্ধ বাবা-মাকে কাঁধে ভর দিয়ে নিচে নামাচ্ছেন।
এই হুড়োহুড়ির মাঝেই নাসরিনকে দ্রুত নিচে নামানোর চেষ্টা করেন তার স্বজনরা। কিন্তু তাড়াহুড়ো, আতঙ্ক আর বিশৃঙ্খলার সেই মুহূর্তে তার মুখে লাগানো অক্সিজেন মাস্ক খুলে যায়। পরিবার বলছে, অক্সিজেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তার শ্বাসকষ্ট তীব্র হয়ে ওঠে। জীবন রক্ষার শেষ চেষ্টার মধ্যেই ধীরে ধীরে থেমে যায় তার শ্বাস। হাসপাতালের সিঁড়ি আর নিচতলার সেই আতঙ্কিত পরিবেশে শেষ হয়ে যায় নাসরিনের লড়াই।
হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. দিলিপ কুমার কুন্ডু বলেন, “নাসরিন নাহার নামে এক রোগী ভেন্টিলেশনে ছিল। সেখানে মোট ১৫ জন রোগী ছিল। আমরা সবাইকে নিরাপদে নিতে পেরেছি। কিন্তু ওই রোগীর স্বজনরা নিজেরাই তাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, রোগী নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।”
নাসরিন নাহারের মৃত্যু যেন এই অগ্নিকাণ্ডের সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রতিচ্ছবি। একটি পরিবার তাকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরানোর স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু চিকিৎসার আশ্রয়স্থল সেই হাসপাতাল থেকেই ফিরতে হলো লাশ হয়ে। আগুনের সেই আতঙ্ক হয়তো একসময় থেমে যাবে, ধোঁয়াও মিলিয়ে যাবে আকাশে কিন্তু নাসরিনের স্বজনদের কাছে এই ভোর হয়ে থাকবে আজীবনের এক গভীর দুঃস্বপ্ন।
আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় ৫০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু আগুনের শিখা নিভলেও, মানুষের বুকের ভেতরের আতঙ্ক আর শোক তখনও দাউদাউ করে জ্বলছিল।
তাৎক্ষণিকভাবে আগুন লাগার সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে অক্সিজেন সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হলেও বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়।