খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বুধবার ভোরে আগুন লাগে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
হাসপাতালের ভোরের নীরবতা হঠাৎই ভেঙে দেয় বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। মুহূর্তেই ধোঁয়া আর আগুনে ঢেকে যায় হাসপাতালের একটি অংশ। রোগী, স্বজন ও চিকিৎসাকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। জীবন বাঁচাতে অনেকে তড়িঘড়ি করে ওয়ার্ড ছেড়ে নিচে নেমে আসেন।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে বুধবার ভোরের চিত্র এটি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বুধবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে খুমেক হাসপাতালের চারতলা ভবনের তৃতীয় তলায় পুরাতন আইসিইউ ইউনিটের পাশের একটি স্টোররুমে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে তা দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১১টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
এ ঘটনায় হাসপাতালের এক নম্বর আইসিইউতে থাকা ১৫ জন রোগীকে দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় একজন রোগীর মৃত্যু হয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আরেকজন রোগী আগুন লাগার আগেই ভোর ৫টার দিকে মারা গিয়েছিলেন।
আগুন থেকে বাঁচতে গিয়ে দুজন নার্সসহ মোট পাঁচজন আহত হন। আহতরা হলেন, হাসপাতালের স্টাফ সাইদুর রহমান (৫০), সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন, দিপালী ও শারমিন এবং ফায়ার সার্ভিস সদস্য তৌহিদ।
ওয়ার্ড বয় রেজাউল জানান, স্টোররুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ধোঁয়ার কারণে ওটি ও পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। ফলে মুমূর্ষু রোগীদের পেছনের দরজা দিয়ে বের করে আনা হয়। আইসিইউর রোগীদেরও দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা আটকে পড়া নার্সদের উদ্ধার করেন। অসুস্থ হয়ে পড়া দুই নার্সকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সরকার মাসুদ আহমেদ জানান, ভোর ৬টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে প্রথমে বয়রা স্টেশন থেকে তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। পরে আরও ইউনিট যুক্ত হয়। পরে মোট ১১টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে অংশ নেয়।
তিনি বলেন, চারতলা ভবনের তৃতীয় তলার স্টোররুমে আগুন লাগে। শুরুতে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল। সব গেটে তালা দেওয়া থাকায় সেগুলো ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। বেলকনি থেকে ৪ থেকে ৫ জনকে উদ্ধার করা হয়।
তিনি আরও জানান, প্রায় ৪৫ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ৫৫ মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে আগুন নিভিয়ে ফেলা হয়। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা শর্ট সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ডা. দিলীপ কুমার বলেন, পুরোনো আইসিইউ ভবনের পাশের একটি কক্ষে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগে। সেখানে পুরোনো কাপড় ও কিছু সরঞ্জাম রাখা ছিল। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েকটি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও পুরোনো এসি বিস্ফোরিত হয়। এতে দেয়ালের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো এলাকায় ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।
তিনি জানান, আইসিইউতে থাকা রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজন রোগী আগুন লাগার আগেই মারা যান এবং আরেকজন রোগী স্থানান্তরের সময় মারা যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের শব্দে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডের রোগী ও স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে নিচে নেমে আসেন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে আইসিইউর রোগীদেরও দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। হাসপাতালের সামনের সড়ক ও মাঠে রোগী-স্বজনদের জড়ো হতে দেখা যায়। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. হোসেন আলী বলেন, প্রাথমিকভাবে শর্ট সার্কিট অথবা এসি বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্তের পর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
খুমেক হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মী আনসার কমান্ডার এসিপি মো. আরিফুল ইসলাম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় গ্রিল কাটতে গিয়ে গ্রিল ভেঙে পড়ে দুজন স্টাফ নার্স ও ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য আহত হন। পরে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে খুলনা সিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
উপ-পরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, বর্তমানে আহতদের চিকিৎসা চলছে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আগুনও পুরোপুরি নিভে গেছে।
তিনি আরও বলেন, অগ্নিকাণ্ডে হাসপাতালের কিছু সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে এসি ইউনিটসহ কিছু অবকাঠামোগত ক্ষতির বিষয় সামনে এসেছে। তবে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাতক্ষণিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট টিম ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণে কাজ করছে। বিস্তারিত মূল্যায়ন শেষে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।