মাসুদুল হাসান
প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬ ১১:২৩ এএম
আপডেট : ২০ মে ২০২৬ ১১:৫৮ এএম
সিএনজিচালিত অটোরিকশা। ফাইল ছবি
প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনের সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়। শহরে নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলাচলে বাসের তীব্র সংকট ও মানহীন সেবার বিপরীতে মধ্যবিত্তের জন্য স্বস্তিদায়ক সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা মাত্র ১৫ হাজার। শহরের সড়কে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও সময়মতো সিএনজি পাওয়া দুষ্কর। পাওয়া গেলেও উচ্চ ভাড়ায় যাতায়াত করতে হয়। এদিকে সরকার গত কয়েক বছর ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন বন্ধ রেখেছে।
বাংলাদেশে ২০০৩ সালে সরকার পরিবেশদূষণ
কমানোর লক্ষ্যে রাজধানীতে ১৩ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশার অনুমোদন দেয়। ২০০১ থেকে ২০০৭
সালের মধ্যে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোর
নিবন্ধন দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগরের জন্য
রিভাইজসড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানের (আরএসটিপি) আওতায় সিএনজি রেজিস্ট্রেশন
বন্ধ রেখেছে সরকার। বিআরটিএ বলছে, এটা সরকারের সিদ্ধান্ত। তারা একে
গণপরিবহন বলতে নারাজ। তারা একে ‘ডোর স্টেপ সার্ভিস’ বলছেন।
দেশে নতুন সিএনজি অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার প্রধান
কারণগুলো হিসেবে বলা হচ্ছে, অতিরিক্ত সিএনজি চলাচল, ট্রাফিক যানজট এবং অবৈধ অটোরিকশার
দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা। তবে রাজধানীর সড়কে একাধিক যাত্রীর সাথে কথা বলে জানা গেছে,
সিএনজি অটোরিকশার স্বল্পতার বিষয়টি তাদের ভোগাচ্ছে। রাজধানীর ৯৫ শতাংশ মানুষ গণপরিবহনের
ওপর নির্ভর করে। ঢাকা শহরে মাত্র ৪ শতাংশ
মানুষের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে। এ গাড়িগুলো ৭৫ শতাংশ জায়গা দখল করে রাখে। বাসের
পরে সিএনজি অটোরিকশার চাহিদা রয়েছে। নতুন করে এর নিবন্ধন বন্ধ করে দেওয়ায় রাজধানীতে
পরিবহন সংকট তৈরি হয়েছে।
ফার্মগেটের বাসিন্দা বেসরকারি কর্মকর্তা
হুমায়রা সুলতানা উত্তরা হাউজ বিল্ডিং এলাকায় নিয়মিত অফিস করেন। বাস না
পেলে দ্রুত যাতায়তের জন্য তিনি সিএনজি অটোরিকশাকে বেছে নেন। তবে ইদানীং অফিসের সময়
বাহনটি সহজে মেলে না। তিনি বলেন, এর নিবন্ধন চালু করে সংখ্যা বাড়ানো উচিত। কারণ হিসেবে
তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ঢাকা শহরে বাসে ওঠা সবসময় সম্ভব হয় না। মধ্যবিত্তের জন্য
সিএনজি অটোরিকশা একটা স্বস্তিকর বিকল্প বাহন। সরকারকে এর স্বচ্ছ ও যাত্রীবান্ধব নীতিমালা
প্রণয়নের ব্যাপারে জোর দিতে হবে।
কল্যাণপুর থেকে কাকরাইল এলাকায় নিয়মিত
যাতায়ত করা বেসরকারি চাকরিজীবী ইদ্রিস শেখ বলেন, সিএনজিচালিত অটোরিকশার
রেজিস্ট্রেশন বন্ধ রেখে উল্টো প্রাইভেটকারের রেজিস্ট্রেশন চালু রাখায় বিষয়টি গোঁজামিল
নীতির বহিঃপ্রকাশ। একটি স্বস্তিকর জনবাহন সম্প্রসারণ সীমিত করা হলে মানুষের দুর্ভোগ
বাড়বে। প্রকাশনা অফিসে কর্মরত এজাজ আহম্মেদ
এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রাইভেটকারের নিবন্ধন উন্মুক্ত রাখার মাধ্যমে লাগামহীনভাবে
এর সংখ্যা বাড়ছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর
ব্যক্তিগত গাড়ি বাড়ার অন্যতম কারণ গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা ও পর্যাপ্ত গণপরিবহন না
থাকা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর
হিসাবমতে, রাজধানী ঢাকার ৭৭ শতাংশ রাস্তা দখল করে রাখে প্রাইভেটকার। এসব গাড়ির
ব্যবহারকারী রাজধানীর ১৫ শতাংশ মানুষ। এর মানে রাজধানীর ৮৫ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করছে
২৩ শতাংশ রাস্তা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে প্রাইভেটকারকে প্রণোদনা
দেওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য গণপরিবহনের অনুমোদন সবসময় উপেক্ষিত থেকেছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ)
নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান ও পরিচালক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ
এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিআরটিএ ঢাকা বিভাগের অফিস থেকে গত ৬ মাসের
(২০২৫ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত) প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা
যায়, এ সময়ের মধ্যে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও জিপ ১৩২২৭টির নিবন্ধন করা হয়। এতে দেখা
যায় গড়ে প্রতিদিন ৭৪টি ব্যক্তিগত বাহন নিবন্ধন হয়েছে।
মিরপুরের সিএনজিচালক আব্বাস মিয়া এই প্রতিবেদককে বলেন, রাজধানীর বাসের
নিকটতম বিকল্প হিসেবে সিএনজি অটোরিকশা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষ। রামপুরার সিএনজিচালক
দীন মোহাম্মদ বলেন, বর্তমান বাসগুলো ঢাকার বাড়তি জনসংখ্যার জন্য যথেষ্ট নয়। নতুন করে
সিএনজি নিবন্ধন চালু করা উচিত। এতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি গণপরিবহন সংকট কিছুটা
সমাধান হবে।
প্রায় ৩০ বছর ধরে ঢাকায় বসবাসকারী প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী মোয়োজ্জেম
হোসেন এই প্রতিবেদককে বলেন, এ শহরে সবার নিজের ব্যক্তিগত বাহন কেনার সক্ষমতা নেই। এ
কারণে মধ্যবিত্তÑ এমনকি নিম্ন-মধ্যবিত্তের জন্য বাসের বিকল্প হিসেবে সিএনজিচালিত অটোরিকশাই
ভরসা। সরকারি পরিবহন সেবাদানকারী বিআরটিসির সাধারণ মানুষের জন্য গণপরিবহন চালানোর কথা,
কিন্তু তারা তাদের বাসগুলো সাধারণত ভাড়ায় দিয়ে রেখেছে। তাহলে সাধারণ মানুষের চলাচলের
উপায় কী?
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি)
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সিএনজিচালিত
অটোরিকশা গণপরিবহনÑ এটা অস্বীকার করা যাবে না। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ বাহন যাত্রা
করেছিল সেটা, পূরণ হয়েছে কি না তা ভেবে দেখতে হবে। এর নিবন্ধন স্থগিত রাখায় রাজধানীতে
গণপরিবহনের কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।
বিআরটিএর একটি সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে বিআরটিএ নতুন আরও সাড়ে তিন হাজার সিএনজি অটোরিকশার অনুমোদন
দেয়। বিআরটিএ এসব সিএনজি অটোরিকশা চালকদের কাছে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলে মালিকপক্ষ এ
অনুমোদনের বিপক্ষে গিয়ে হাইকোর্টে রিট করে। হাইকোর্ট চালকদের পক্ষে রায় দেন। এ রায়ের
বিপক্ষে মালিক সমিতি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করলে সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের এ রায় বহাল
রাখেন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মালিক সমিতি এ রায় রিভিউ করার জন্য পুনরায় আবেদন জানায়।
বিআরটিএ পরিচালক (অডিট ও আইন) রুবাইয়াত-ই-আশিক
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এটি আদালতের বিষয়, কবে রায় আসবে তা বলতে পারছেন
না।