গত মঙ্গলবার মহিষখলা বাজারের দৃশ্য। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঈদুল আজহা উপলক্ষে ভারতীয় গরু আমদানি বন্ধে সীমান্ত এলাকায় কোনো কোরবানির হাট ইজারা না দিতে ও সীমান্তে কোন পশুর হাট না বসানোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রাণিসম্পদমন্ত্রী।
দেশি গরুর চাহিদা বাড়াতে এবার কোরবানির ঈদের আগে সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট-ইজারা না দিতে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ এ নির্দেশনা দেন।
কিন্তু তার নির্দেশনা অমান্য করেই সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার ভারতের মেঘালয় পাহাড় সীমান্তবর্তী মহিষখলা গরু হাটে ভারতীয় গরুর হাট বসিয়ে রমরমা ব্যবসা পরিচালনা করছেন সিন্ডিকেট চক্র।
স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, মধ্যনগর উপজেলার মহিষখলা সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন চোরাই পথ দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে অবাধে প্রবেশ করছে গরু-মহিষের চালান। আর এসব অবৈধ গরুর বৈধতা দিচ্ছেন মহিষখলা বাজারের গরু হাটের অসাধু ইজারাদাররা।
গত ৩ মে সচিবালয়ে প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেছিলেন, “সীমান্তে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে এবং দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় এবার সীমান্তবর্তী এলাকায় কোনো পশুর হাট ইজারা দেওয়া হবে না। এমনকি কোন হাটও বসবেনা”।
খামারিদের দাবি, মন্ত্রীর নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই শত-শত ভারতীয় গরু, মহিষসহ বিভিন্ন পশু বেচাকেনা করছেন মধ্যনগর সীমান্তবর্তী মহিষখলা বাজার পশুহাটের অসাধু ইজারাদাররা।
তাদের ভাষ্য, এ ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও রহস্যজনক কারণে নিরব ভূমিকা পালন করে আসছেন।
উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলার মহিষখলা হাটটি ইজারা দেওয়ার জন্য ১ কোটি ১৬ লাখ ৬২ হাজার ৬৬৮ টাকা বার্ষিক ইজারামূল্য নির্ধারণ করে পাঁচবার দরপত্র আহ্বান করে উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে কোনো দরপত্রদাতা না পাওয়ায় গত ৩ বৈশাখ থেকে অবশিষ্ট সময় ৩০ চৈত্র ১৪৩৩ বাংলা সন পর্যন্ত খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয় উপজেলা প্রশাসন।
পরে সে মোতাবেক ৬১ লাখ ৪০ হাজার টাকা ইজারা মূল্যে হাটটি খাস কালেকশনে ইজারা নেন বংশীকুণ্ডা উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. মোক্তার হোসেন।
এদিকে মহিষখলা বাজারটি ভারতের মেঘালয় পাহাড় সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় সহজেই ভারত থেকে অবৈধ পথে আনা গরু, মহিষসহ বিভিন্ন পশুতে সয়লাব থাকে। আর এসব অবৈধ গরু ও মহিষকে বৈধতা দিয়ে প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এ কারণে কোরবানির ঈদ পর্যন্ত ওই পশুর হাটটি বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় খামারিরাসহ কৃষকরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অবৈধভাবে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গরু-মহিষ এপারে আনা মাত্রই মহিষখলা বাজারের ইজারাদারের লোকজন গরু প্রতি ১ হাজার টাকা ও প্রতিটি মহিষের জন্য ২ হাজার টাকা করে নিয়ে ক্রয়-বিক্রয়ের বৈধতা (হাসিল) দিচ্ছেন। আর তাদের দেয়া এই কাগজের বলেই ভারতীয় গরু-মহিষ বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাট-বাজারগুলোতে।
বিশেষ করে ওইসব অবৈধ গরু-মহিষের বড় মোকাম হলো পাশের নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা উপজেলার নৈহাটী বাজার গরুহাট ও ধর্মপাশা বাজার গরুরহাট। এরমধ্যে প্রতি বৃহস্পতিবার বসে ধর্মপাশা গরুহাট ও প্রতি সোমবারে বসে বারহাট্টার নৈহাটি বাজার গরু হাট। এ দুটি বাজারে কয়েক হাজার ভারতীয় গরু ও মহিষ কেনা-বেচা হয় বলে দাবি ব্যবসায়ী ও স্থানীয় এলাকাবাসীর।
এদিকে সুনামগঞ্জের সাথে ভারতের সীমান্ত রয়েছে ১২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মধ্যনগর উপজেলার অন্তত ৬টি সীমান্ত স্পটে এসব চোরাকারবারের সাথে স্থানীয় প্রায় পাঁচ শতাধিক চোরাকারবারি জড়িত রয়েছেন।
এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য মতে, মধ্যনগর উপজেলার এসব স্পটগুলো হচ্ছে- বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের মহেষখলা, কাইটাকোনা, কড়ইবাড়ী (কড়ই চড়া), আমতলা, ঘিলাগড়া ও বাঙ্গালভিটা। এসব স্পট দিয়ে প্রতিদিন গবাদি পশুসহ ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে নিয়ে আসছে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যনগর উপজেলার বংশীকুন্ডা উত্তর ইউনিয়নের একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মহিষখলা বাজারের গবাদিপশুর হাটকে কেন্দ্র করেই মূলত এখানকার একটি চোরাকারবারি চক্র সক্রিয় রয়েছেন।
গরু ও মহিষ চোরাকারবারের সাথে মহিষখলা বাজার ইজারাদার সিন্ডিকেটের লোকজন সরাসরি জড়িত বলেও জানান তারা।
তারা আরও বলেন, মহিষখলা বাজারের ইজারাদার সিন্ডিকেট সদস্যরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক দলের নেতা। তাই এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহিষখলা বাজারের এক গরু ব্যবসায়ী বলেন, “ভারত থেকে অবৈধ পথে আসা গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়া না আসলে ওই বাজারটি বছরে ৫০ হাজার টাকায়ও কেউ ইজারা নিবেনা”।
তিনি আরও বলেন, “ভারত থেকে আনা আমাদের কোনো গরু-মহিষকে মহিষখলা গরু হাটে নিতে হয়না। আমরা অবৈধ এসব পশু বাজারের আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামে রাখি। পরে ইজাদারের লোকজনকে খবর দিলে তারা গ্রামে এসে গরু প্রতি ১ হাজার ও মহিষ প্রতি ২ হাজার টাকা আমাদের কাছ থেকে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বৈধতার রশিদ দিয়ে যান এবং আমরাও গ্রামে রেখেই ওইসব পশু পাইকারদের কাছে বিক্রি করে আসছি। তবে আমরা যতটুকু জানি ওই টাকার ভাগ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও দেয়া হয় বলেই আমাদেরকে এ ব্যবসা করতে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়না”।
এ বিষয়ে মহিষখলা বাজারের ইজারাদার ও বংশিকুন্ডা উওর ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি মো. মোক্তার হোসেন বলেন, “প্রতি মঙ্গলবার মহিষখলা বাজারের গরুর হাট বসে। আলাদা করে কোরবানির হাট বসে না। সীমান্তে পশুর হাট বন্ধ রাখার সরকারি নির্দেশনা আছে বলে আমার জানা নেই”।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনও তাকে কিছু জানায়নি বলেও তিনি জানান।
এ বিষয়ে মধ্যনগর থানার ওসি একেএম সাহাবুদ্দিন শাহীনের ব্যবহৃত সরকারি মোবাইল ফোনে একাধিক বার কল করলেও তিনি কলটি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়েও এ ব্যাপারে তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপজেলা ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জয় ঘোষ বলেন, “সীমান্তে পশুর হাট বন্ধের নির্দেশনা রয়েছে। মহিষখলা পশুর হাট বন্ধ থাকবে। আগামী মঙ্গলবার যদি সেখানে গরুর হাট বসানো হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে”।
সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির বলেন, “ঊর্ধ্বতন সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির অভিযানিক কার্যক্রম ও গোয়েন্দা তৎপরতা সর্বতোভাবে অব্যাহত রয়েছে”।