সাতক্ষীরা ও শ্যামনগর প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ ১৯:২৯ পিএম
আপডেট : ১৮ মে ২০২৬ ১৯:৪৯ পিএম
দুপুর দেড়টার দিকে আমিনুরের গুলিবিদ্ধ মরদেহ নিয়ে তার সহকর্মী জেলেরা লোকালয়ে ফিরে আসেন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সুন্দরবনে গুলিতে আমিনুর রহমান (৪৫) নামে এক কাঁকড়া শিকারি জেলে নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। জেলেদের দাবি বনবিভাগের স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের সদস্যদের ছোড়া গুলিতে তার মৃত্যু হয়েছে।
সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের পাটকোস্টা হেলাবাসী অভয়ারণ্য (শতমুখি খাল) এলাকায় সোমবার সকাল ৭টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। দুপুর দেড়টার দিকে আমিনুরের গুলিবিদ্ধ মরদেহ নিয়ে তার সহকর্মী জেলেরা লোকালয়ে ফিরে আসেন।
নিহত আমিনুর রহমান সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা এলাকার বাসিন্দা আকসেদ গাজীর ছেলে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বনবিভাগের অফিস ভাঙচুর ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের মারধর করে বিক্ষুব্ধ জনতা। পরে পুলিশ এবং বিজিবি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কালিগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজীব এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নিহতের সহকর্মী আহাম্মাদ আলী, সেলিম ও রমজানের বরাত দিয়ে স্থানীয়রা জানান, গত ১৩ মে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে বৈধ পাস (অনুমতিপত্র) নিয়ে তারা চারজন কাঁকড়া আহরণের জন্য সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। সোমবার সকালে তারা সুন্দরবনের শতমুখি খালে কাঁকড়া ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় বনবিভাগের খুলনা স্মার্ট পেট্রোল টিমের সদস্যরা তাদের ডাক দেন। জেলেরা কাছে না গেলে বনবিভাগের সদস্যরা গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ করেন তারা। এতে আমিনুর রহমান গুলিবিদ্ধ হন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জানান সঙ্গীরা।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, “সাতক্ষীরা রেঞ্জ এবং বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জ দুটো পাশাপাশি। বিক্ষুব্ধ জনতা এখানে সবার উপর হামলা করেছে। করও মাথা ফেটে গেছে, কারও অন্যান্য আঘাত লেগেছে। এখন আমরা নিরাপত্তা শঙ্কায় ভুগছি”।
কালিগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজীব বলেন, “সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের একটা ঘটনা। যে জেলেটা গুলিবিদ্ধ হয়েছিল ওনার বাড়ি হল সাতক্ষীরা রেঞ্জে, সাতক্ষীরা রেঞ্জের গাবুরা ইউনিয়নে। ওনি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যুবরণ করেন। এটাকে কেন্দ্র করে গাবুরা ইউনিয়নের লোকজন সাতক্ষীরার বনবিভাগের অফিগুলোতে হামলা করে। এটা নিয়ে একটা উত্তপ্ত পরিস্থিতি ছিল। এখন এটা স্বাভাবিক আছে। মরদেহ সুরতহাল করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। হামলায় ৫ জন আহত হয়েছে। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে”।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বনবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “সুন্দরবনের ভেতরে বর্তমানে বনদস্যু নির্মূলে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। সেখানে বনবিভাগ, কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য বাহিনী একযোগে দায়িত্ব পালন করছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও কার গুলিতে এই ঘটনা ঘটেছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে”।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “বনবিভাগের সদস্যদের গুলিতে নিরপরাধ জেলের মৃত্যুর ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি ইতোমধ্যে খুলনার ডিএফও, সাতক্ষীরার এসিএফ, শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং স্থানীয় থানাকে বিষয়টি অবহিত করেছি”।
তিনি আরও জানান, খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, একটি সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমানে মরদেহ নিয়ে নিহতের পরিবার ও প্রশাসন পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামসুজ্জাহান কনক জানান, গুলিতে এক বনজীবী নিহতের ঘটনায় উপকূলীয় এলাকায় বসবাসরত বনজীবীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় নেয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।