× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাংলাদেশের সবচেয়ে লম্বা পাখির খোঁজে একদিন

খোর্শেদ আলম, জুড়ী (মৌলভীবাজার)

প্রকাশ : ১৮ মে ২০২৬ ১৪:৫৩ পিএম

কালো-গলা মানিকজোড়। ছবি: উজ্জ্বল দাস

কালো-গলা মানিকজোড়। ছবি: উজ্জ্বল দাস

মৌলভীবাজারের সেই বিলটিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল ঠিক আটটা। কুলাউড়া থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাতে রওনা হয়েছিলাম আমি আর বিশিষ্ট বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রগ্রাহক সৈয়দ আব্বাস। শীতের সকালের কাঁপুনিধরা ঠান্ডা যেন অটোরিকশার পর্দা ভেদ করে শরীরে ঢুকে যাচ্ছিল। চারপাশ তখন ঘন কুয়াশায় ঢাকারাস্তার দুপাশের গাছপালাগুলোও ঠিকমতো চোখে পড়ছিল না। কিন্তু প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আর পরিযায়ী পাখিদের দেখার আগ্রহ আমাদের এগিয়ে নিচ্ছিল

মৌলভীবাজার জেলার এই বিলটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাখির অভয়ারণ্য। শীত নামলেই এখানে ভিড় জমায় হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি। খাবারের প্রাচুর্য, নিরাপদ জলাভূমি আর অনুকূল পরিবেশ যেন দূরদেশের পাখিদের আমন্ত্রণ জানায় প্রতি বছর। তাই শীতের কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে সেদিন আমরা ছুটে গিয়েছিলাম সেই জলাভূমির টানে

বিলে পৌঁছেই চোখে পড়ল খয়রা কাস্তেচরা আর কালো-মাথা কাস্তেচরার বড় ঝাঁক। কাদা খুঁটে তারা খাবার তুলছিল কেঁচো, ছোট মাছ, পোকামাকড়ের লার্ভা। আশপাশে কালিম, জলমুরগি, ধূসর বক, পাতি তিলিহাঁস, ভুতিহাঁস, পিয়ং হাঁস, গিরিয়া হাঁস, শামুকখোল আর চা পাখির আনাগোনা যেন পুরো বিলটাকে এক জীবন্ত প্রকৃতি-চিত্রে পরিণত করেছিল। যদিও ঘন কুয়াশার কারণে ভালো ছবি তোলা সম্ভব হচ্ছিল না, তবু পাখিদের ডাক আর খাবার খোঁজার ব্যস্ততা মনকে অন্যরকম প্রশান্তি দিচ্ছিল

আমি আর আব্বাস ভাই ওয়াচ টাওয়ারে বসে অপেক্ষা করছিলাম কুয়াশা কাটার। সময় গড়াতে গড়াতে দুপুর বারোটার দিকে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে কুয়াশার চাদর সরিয়ে দিতে শুরু করল। চারপাশ স্পষ্ট হতে লাগল। আর ঠিক তখনই চোখ আটকে গেল দূরের জলাভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশালদেহী পাখির দিকে। প্রথম দেখাতেই বোঝা যাচ্ছিল এটি সাধারণ কোনো পাখি নয়। এর উচ্চতা এতটাই বেশি ছিল যে আশপাশের ধূসর বকগুলোকে তুলনায় ছোট দেখাচ্ছিল। দূরবীন তাকাতেই চেনা গেল সেই বিরল অতিথিকে কালো-গলা মানিকজোড়

মুহূর্তেই আমি আর আব্বাস ভাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠলাম। কারণ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর ও গঙ্গা অববাহিকার কিছু চর এলাকায় খুব সীমিতভাবে দেখা মেলে এই বিরল পাখির। এত কাছ থেকে একে দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই রোমাঞ্চকর

কালো-গলা মানিকজোড় মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আবাসিক পাখি। ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া কিংবা ভিয়েতনামের জলাভূমিতে এদের দেখা মেলে। বাংলাদেশে এরা আংশিক পরিযায়ী। শীতকালে জলাভূমির পানি কমতে শুরু করলে খাবারের খোঁজে এরা আমাদের দেশে আসে। মাছ, ব্যাঙ, শামুক, কেঁচো, ছোট সরীসৃপ সবই এদের খাদ্যতালিকায় থাকে। ফলে জলাভূমির খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে

পাখিটির দিকে তাকিয়ে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছিল এর রাজকীয় সৌন্দর্য। চকচকে কালো গলা, সাদা দেহ, লম্বা কালো ঠোঁট আর লাল পা সব মিলিয়ে যেন জলাভূমির এক অভিজাত প্রহরী। সূর্যের আলো পড়তেই গলার কালো অংশে সবুজ-নীল ঝিলিক ফুটে উঠছিল।

বর্তমানে এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে লম্বা পাখি। এর উচ্চতা প্রায় ১২৯ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। একসময় বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলে আরও বড় আকারের সারস ক্রেন দেখা যেত, কিন্তু আবাসস্থল ধ্বংস, অতিরিক্ত মানব হস্তক্ষেপ আর পরিবেশ দূষণের কারণে সেই পাখি এখন দেশ থেকে বিলুপ্ত

প্রাণীবিদ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে- প্রাণীর দেহ যত বড়, তার বিলুপ্তির ঝুঁকিও তত বেশি। কারণ বড় দেহের প্রাণীদের খাবার ও আবাসস্থলের চাহিদা বেশি, আর প্রজননও তুলনামূলক ধীর। কালো-গলা মানিকজোড়ও সেই ঝুঁকির বাইরে নয়

গবেষণায় জানা যায়, বর্ষাকাল বা বর্ষা-পরবর্তী সময় এদের প্রজনন মৌসুম। জলাভূমির আশপাশের বড় গাছে ডালপালা দিয়ে বিশাল আকৃতির বাসা তৈরি করে তারা। সেই বাসার ব্যাস হতে পারে তিন থেকে ছয় ফুট পর্যন্ত। সাধারণত দুই থেকে পাঁচটি ডিম দেয় এবং মা-বাবা দুজনেই সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব নেয়

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) অনুযায়ী বাংলাদেশে কালো-গলা মানিকজোড় এখন বিপন্ন প্রাণী। ধারণা করা হয় দেশে এদের সংখ্যা ২৫০টিরও কম। অথচ যেসব বিল ও হাওর একসময় ছিল তাদের নিরাপদ আশ্রয়, সেগুলো আজ মানুষের দখল, অতিরিক্ত মাছ ধরা, দূষণ আর অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের চাপে ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে

মৌলভীবাজারের সেই বিলেও একই চিত্র দেখা গেল। সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার পরও সেখানে দিন-রাত মাছ ধরা, পর্যটকদের অতিরিক্ত ভিড় আর নানা ধরনের বিরক্তিকর কর্মকাণ্ড চলছিল। এসবের ফলে শুধু কালো-গলা মানিকজোড় নয়, অন্যান্য আবাসিক ও পরিযায়ী পাখিরাও হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়

তবু সেই দুপুরে জলাভূমির নিস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে থাকা কালো-গলা মানিকজোড়টিকে দেখে মনে হচ্ছিল প্রকৃতি এখনও পুরোপুরি হার মানেনি। হয়তো একটু সচেতনতা, সঠিক সংরক্ষণ আর মানুষের সদিচ্ছা থাকলে এই বিরল পাখিগুলো আবারও নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারবে বাংলাদেশের হাওর-বিলে কারণ সত্যিই পাখিরা বাঁচলেই বাঁচবে আমাদের বাস্তুতন্ত্র।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা