কবির হোসেন, ঢাকা ও রেজাউল করিম, গাজীপুর
প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬ ১২:০৯ পিএম
আপডেট : ১৭ মে ২০২৬ ১২:১০ পিএম
গাজীপুরের মানচিত্র। ছবি: বাসস
অ্যাকশন থ্রিলার সিনেমা ‘দ্য কিলিং জোন’। ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত পাওয়া এ সিনেমায় একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে (মাদকসম্রাট) ধরতে ও নির্মূল করতে গোপন মিশন পরিচালিত হয়। একটি নির্মম ও দুঃসাহসিক অভিযানের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে কাহিনী। ‘কিলিং জোন’ নামে আছে একটি ফাইটিং ভিডিও গেমও। যেখানে খেলোয়াড়রা হত্যাসহ নানা রকম অ্যাকশনে জড়িয়ে পড়ে। তারা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য রোমাঞ্চকর মিশনে অংশ নেয়।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকার পাশের জেলা গাজীপুর যেন সিনেমা ও ভিডিও গেমের ‘কিলিং জোন’ হয়ে উঠেছে। এ জেলায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে একের পর এক। মাত্র আট দিনে ১২ খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের একজন ‘ফোরকান’ হার মানিয়েছেন সিনেমাকেও। তিনি নিজেই সেতুর ওপর থেকে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন, যার লাশ উদ্ধার হয়েছে শনিবার।
আট দিনে ১২ লাশ উদ্ধার, ৭টিই গলাকাটা, আতঙ্কে এলাকাবাসী
পোশাক শিল্পের জন্য খ্যাত গাজীপুর সাম্প্রতিক একাধিক হত্যাকাণ্ডের নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ৮ দিনে ১২টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় এলাকাবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার নাজুক পরিস্থিতিও হচ্ছে আলোচিত। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, গাজীপুরে নৃশংসতা ও হত্যার ঘটনা বৃদ্ধির বড় কারণ মাদকের বিস্তার, বিশাল অস্থায়ী ও ভাসমান জনগোষ্ঠী আর পারিবারিক কলহ। দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও একই সুরে কথা বলেছেন।
জেলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ৩৮ শতাংশ মানুষ নিজের বাড়িতে বসবাস করেন; বাকি সবাই ভাড়া বা অন্য জেলা থেকে এখানে এসেছেন। টঙ্গীর ১৭টি বস্তি, বিশেষ করে মাজার বস্তিÑ অপরাধ ও মাদক ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কিছুদিন পর পর অভিযান পরিচালনা করলেও অপরাধীরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠে। বস্তিতে নিয়মিত মাদক বিক্রি, অস্ত্র ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া অসমাপ্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প (বিমানবন্দর-গাজীপুর সড়ক) অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। উড়াল সেতু, সিঁড়ি ও র্যাম্প এলাকায় প্রতিনিয়ত ছিনতাই-খুনের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুরে সংঘটিত অপরাধের অধিকাংশই বিআরটি প্রকল্প এলাকা ঘিরে।
গত ৯ মে সকাল থেকে ১৬ মে পর্যন্ত আট দিনে গাজীপুর জেলা ও মহানগর থেকে ১২টি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে ৭ জনকে গলা কেটে হত্যা, ৪ জনকে পিটিয়ে হত্যা ও একজনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ৯ মে সকালে কাপাসিয়া উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের রাউৎকোনা গ্রামে নৃশংসভাবে খুন করা হয় একই পরিবারের শিশুসহ পাঁচজনকে। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন, শারমিন খানম (৩৫), তার তিন মেয়ে মিম (১৬), মারিয়া (৮), ফারিয়া (২) ও শারমিনের ছোট ভাই রসুল মোল্লা (২২)। এ হত্যাকাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লার মরদেহ মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার হয়েছে।
শনিবার বিষয়টি নিশ্চিত করেন মাওয়া নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) মো. ইলিয়াস। তিনি জানান, পদ্মা সেতু থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে লৌহজং উপজেলা ভূমি অফিস সংলগ্ন পদ্মা নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা নৌ পুলিশে খবর দেয়। পরে নৌ পুলিশ দুপুর ১২টার দিকে মরদেহটি উদ্ধার করে।
তিনি আরও জানান, গাজীপুরের পাঁচ হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফোরকান মোল্লার পরিবারের সদস্য ও কাপাসিয়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা মরদেহটি প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছেন। লাশের সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ১১ মে ফোরকানের মোবাইলটি মেহেরপুর থেকে উদ্ধার করে। এক ট্রাকচালকের সহযোগী ওই দিন সকালে সেতুর মাঝামাঝি রেলিংয়ের পাশে মোবাইলটি পড়ে থাকতে দেখে তুলে নিয়ে যান। পরে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজেও দেখা গেছে, সকাল ৬টা ৪২ মিনিটে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরিহিত এক ব্যক্তি সাদা রঙের প্রাইভেট কার থেকে সেতুর মাঝামাঝি স্থানে নামেন। তিনি মোবাইল পাওয়ার স্থানে কিছু একটি রেখে ২ থেকে ৩ মিনিট অবস্থান করেন। একপর্যায়ে সেতুর রেলিং টপকে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দেন। ঝাঁপ দেওয়া ব্যক্তিটি ছিলেন আসামি ফোরকান মোল্লা।
৯ মে সন্ধ্যার দিকে উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান বাজারে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে ষাটোর্ধ্ব এক বিএনপি নেতাকে সালিশে ডেকে নিয়ে ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। মারধরের দুই দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত জয়নাল আবেদীন উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাওগান গ্রামের মৃত নইমুদ্দিনের ছেলে।
১০ মে কালিয়াকৈর উপজেলার ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের বাগচালা গ্রামে গরুচোর সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করে ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’। এ সময় তাদের ব্যবহৃত একটি ট্রাকও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। একটি মামলা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা। ১২ মে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানার ওঝারপাড়া গ্রামের মহরের বাড়ি-সংলগ্ন এলাকায় শুভ নামের এক অটোরিকশা চালককে গলা কেটে হত্যার পর অটোরিকশা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। শুভ নেত্রকোণা জেলার মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী গ্রামের আমির মিয়ার ছেলে। এ ছাড়া ১৪ মে শ্রীপুরের রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ডোয়াইবাড়ি গজারি বনের ভেতর থেকে আসিফ হেসেন (২১) নামে এক অটোরিকশা চালকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই দিনে টঙ্গী পূর্ব থানার মরকুন পূর্বপাড়া এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে ফারুক হোসেন (৩৭) নামের এক ব্যক্তির ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এর আগে ২৯ এপ্রিল গাজীপুরের টঙ্গীতে একটি বস্তিতে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গেলে দুর্বৃত্তদের টার্গেটে পরিণত হয় স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ওইদিন রাতে টঙ্গী পূর্ব থানার হিমারদীঘি (আমতলী) কেরানীরটেক এলাকায় মাদক উদ্ধার অভিযানে হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। হামলায় চার পুলিশসহ কমপক্ষে ৫ জন আহত হন। পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক, নিজেদের জানমাল ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষার্থে চারটি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। সেই অভিযানে সাত জনকে আটক করা হয়। এ বিষয়ে টঙ্গী পূর্ব থানার ওসি মেহেদী হাসান বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওইদিন রাত ১০টার দিকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপির) গোয়েন্দা (ডিবি-উত্তর ও দক্ষিণ) বিভাগের একটি দল টঙ্গী পূর্ব থানার হিমারদীঘি (আমতলী) কেরানীরটেক এলাকায় মাদক উদ্ধারে যৌথ অভিযানে যায়। একাধিক মাদক মামলার আসামি রুনা আক্তারের বাসার সামনে উপস্থিত হলে আসামিরা চিৎকার করে আরও লোকজন জড়ো করে গোয়েন্দা পুলিশের ওপর হামলা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ চারটি ফাঁকা সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায়। হামলায় চার পুলিশসহ পাঁচ জন আহত হয়। পুলিশ ধাওয়া করে সাত জনকে আটক করে টঙ্গী পূর্ব থানায় নিয়ে আসে। মাদক মামলার আসামি রুনা আক্তারসহ অন্যরা দৌড়ে পালিয়ে যায়।
গাজীপুরের অপরাধ প্রবণতা শুধু হত্যাকাণ্ড নয়। ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র ব্যবহার ও অসমাপ্ত নগর প্রকল্প দখল নিয়ে হানাহানি ঘটছেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, র্যাব, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের চেষ্টা থাকলেও পরিস্থিতি কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এলাকাবাসী বলছেন, জেলায় হঠাৎ করেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে সামাজিক অবক্ষয়। সমাজটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে আতঙ্ক বাড়ছে সাধারণ মানুষের, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কঠোর দেখতে চান। এলাকার সমাজকর্মী আরিফুল ইসলাম বলেন, সমাজে মাদক বেড়েছে। মাদকের পাশাপাশি বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা রয়েছে। মূলত মাদকে আসক্ত মানুষই অনেক অপকর্ম করছে। পাশাপাশি অটোরিকশা ছিনতাইকারীও বেড়েছেÑ যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) গাজীপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আমাদের সুজনের ভাইস প্রেসিডেন্টকে মেরে ফেলা হয়েছে। তিন মাস হয়ে গেছে এখনও কোনো ক্লু বের করতে পারেনি পুলিশ। মার্ডার করার পর যদি বিচার না পায়, দোষীদের শনাক্ত না করা যায়, তাহলে হত্যাযজ্ঞ চলতেই থাকবে। কোনো অপরাধের কারণে ত্বরিত গতিতে যদি কোনো বিচার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে অপরাধ কমত। প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে। এখানে ভাসমান লোক বেশি, কেউ কাউকে চেনে না, অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, বিপুলসংখ্যক ভাসমান মানুষের কারণে অপরাধ বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা অপরাধীরা গাজীপুরে গা-ঢাকা দেয়। তারা একসময় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে, এরপর অন্যত্র চলে যায়। এজন্য র্যাবের টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যানুসারে, অপরাধে জড়িতদের অধিকাংশের নামে থানায় মামলা রয়েছে। অনেকে জামিনে বের হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িত হচ্ছে।
গাজীপুর পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দীন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। বিভিন্ন ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে গাজীপুরে সংঘটিত ঘটনার প্রায় সবগুলোর কারণ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।