প্লাবন শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর)
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬ ১১:৪২ এএম
আপডেট : ১৫ মে ২০২৬ ১৫:২৪ পিএম
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়েনের বাসুদেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পের তালাবদ্ধ ঘর, যেখানে ১৬৫টি বাড়ির মধ্যে মাত্র ৫০টি সুবিধাভোগী পরিবার বসবাস করছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি আলাদিপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প। এখানে দুই পুকুর পাড় ঘেঁষে নির্মিত ১৬৫টি ঘরের অধিকাংশই এখন তালাবদ্ধ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
গৃহহীনদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই প্রকল্পে বসবাস না থাকায় এলাকাজুড়ে নীরবতা ও অনিশ্চয়তার চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন ও ছিন্নমূল পরিবারকে স্থায়ী আশ্রয় দেওয়া, কিন্তু বাস্তবে অনেকেই এখানে বসবাস না করে আগের জায়গায় ফিরে গেছেন বা অন্যত্র অবস্থান করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে ফুলবাড়িতে থাকা অন্যান্য আশ্রয়ণ প্রকল্পেরও একই চিত্র দেখা যায়।
একা বসবাসকারী বৃদ্ধের ভয় ও বাস্তবতা
আশ্রয়ণ প্রকল্পের দক্ষিণ পাড়ের ১১টি বাড়ির মধ্যে একমাত্র বাসিন্দা হিসেবে বসবাস করছেন সত্তরোর্ধ্ব আব্দুর রশিদ।
তিনি জানান, ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিবারকে এখানে আনতে পারেননি।
তিনি বলেন, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালনের মতো স্বাভাবিক জীবন এখানে সম্ভব নয়। চুরি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে একা বসবাস করছেন। নিজের বাড়ি কুড়িগ্রামের উলিপুরে হলেও চাকরির কারণে তিনি এখানে থাকেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আশপাশের বাড়িগুলোতে মানুষ আনার চেষ্টা করেও সফল হননি। এমনকি জনৈক প্রতিনিধিকে টাকা দিয়েও কোনো ফল পাননি বলে জানান তিনি।

ঘর থাকলেও নেই মানুষ, তালাবদ্ধ অধিকাংশ ঘর
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, বাসুদেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ১৬৫টি ঘরের মধ্যে মাত্র ৫২টি পরিবার নিয়মিত বসবাস করছে। বাকি ঘরগুলোতে ঝুলছে তালা।
অনেক পরিবার বরাদ্দ পাওয়া ঘর ব্যবহার না করে আগের ঠিকানাতেই থেকে গেছে। কেউ কেউ মৌসুমি কাজের জন্য বাইরে থাকেন, আবার কেউ নিরাপত্তা ও জীবিকার অভাবে এখানে স্থায়ী হননি।
রাস্তা, কাজ ও মৌলিক সুবিধার সংকট
বাসিন্দাদের অভিযোগ অনুযায়ী, আশ্রয়ণ এলাকায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যোগাযোগ ও জীবিকার সুযোগের অভাব।
তারা বলেন, আশ্রয়ণ থেকে মূল সড়কে যাওয়ার পথ কাঁচা, যা বর্ষায় চলাচল অযোগ্য হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয় এখানে কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নেই।
সুপেয় পানির সমস্যার পাশাপাশি এখানে ধর্মীয় উপাসনালয়ও নেই, ফলে অনেকেই এখানে স্থায়ীভাবে থাকতে আগ্রহী হচ্ছেন না বলেও জানান তারা।
বরাদ্দে অনিয়ম ও সামাজিক নিরাপত্তার অভিযোগ
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ঘর বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। কেউ কেউ বরাদ্দ পাওয়ার পরও অন্যত্র থাকছেন, আবার কিছু ঘর অন্যদের দেখভালের জন্য রেখে গেছেন।
ফলে কিছু ঘর শুধু গবাদিপশু বা হাঁস-মুরগি রাখার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। বাসিন্দারা জানান, নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই রাতে ভয় পান এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন না।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকার ঘর, বাস্তবতা ভিন্ন
জানা যায়, ফুলবাড়ী উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে চার ধাপে নির্মিত হয়েছে মোট ১ হাজার ২৭০টি ঘর। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি ৫ লাখ টাকা।
প্রতিটি ঘর দুই শতক জমির ওপর দুই কক্ষবিশিষ্ট আধাপাকা ঘর হিসেবে নির্মাণ করা হয়। বিভিন্ন ধাপে ঘরের ব্যয় ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল।
তবে বাস্তবে অনেক ঘর এখন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
বালুপাড়া আবাসনে একই চিত্র
উপজেলার সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ প্রকল্প খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের বালুপাড়া আবাসনেও একই অবস্থা দেখা গেছে।
এখানে ২৪৪টি ঘরের মধ্যে মাত্র ১০৭টিতে মানুষ বসবাস করছে। বাকি ঘরগুলো ফাঁকা। কিছু ঘর ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় গোপনে হস্তান্তরের অভিযোগও উঠেছে।
অনেকেই বছরে একবার এসে ঘর দেখে যান, আবার ফিরে যান নিজ এলাকায়। নিরাপত্তাহীনতা ও কাজের অভাবকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাসিন্দারা।
অন্যান্য আশ্রয়ণেও একই বাস্তবতা। এর মধ্যে পুকুরি মোড় আবাসনে ৮টির মধ্যে ৩টি ঘরে, শিবপুরে ৩৪টির মধ্যে ৫টি ঘরে মানুষ থাকে। এখানের বেশিরভাগ পরিবার মৌসুমি কাজে বাইরে থাকেন।
বাসিন্দারা জানান, রিকশা-ভ্যান চালানো বা দিনমজুরির জন্য তাদের দূরে যেতে হয়, তাই তারা স্থায়ীভাবে এখানে থাকতে পারেন না।
‘দেখতে সুন্দর, কিন্তু প্রাণহীন গ্রাম’
স্থানীয়দের মতে, দূর থেকে রঙিন ঘরগুলো দেখলেও বাস্তবে এটি এখন অব্যবহৃত ও প্রাণহীন এলাকায় পরিণত হয়েছে। ২৫ কোটি টাকার প্রকল্প এখন অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনাগত দুর্বলতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খয়েরবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শামীম হোসেন বলেন, অনেকেই এখানে স্থায়ীভাবে থাকেন না। কেউ কাজের জন্য বাইরে চলে যান, আবার কেউ অন্যদের দিয়ে ঘর দেখভাল করান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ হাছান জানান, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। দ্রুত সব আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করে বাস্তব সমস্যার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।