ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬ ১৪:৪৭ পিএম
আপডেট : ১৪ মে ২০২৬ ১৪:৫০ পিএম
চিকনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নবনির্মিত ভবন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কক্সবাজারের মহেশখালীতে উপজেলার কালারমারছড়া চিকনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যাভিলিয়ন বিল্ডার্স ও সাবেক ছাত্রলীগ নেতা হালিমুর রশিদের বিরুদ্ধে দুই কোটি ১২ লাখ টাকার এই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ শাসনামলে ছাত্রলীগের প্রভাব খাটিয়ে কাজটি নেওয়ার পর বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ‘বাটোয়ারা’ করে এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা ও স্কুল কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে অনিয়ম চালানো হচ্ছে।
তাদের দাবি, ভবনের বেজ ভরাট করা হয়েছে পাশের মসজিদের জানাজার মাঠ কেটে নেওয়া মাটি দিয়ে, ফলে জানাজার মাঠ সংকুচিত হয়ে স্থানীয়রা দুর্ভোগে পড়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনের পিলার ও ঢালাইয়ের কাজে সরকারি শিডিউলে নির্ধারিত ‘সিলেট স্যান্ড’ তথা উন্নত বালুর পরিবর্তে স্থানীয় ছড়ার কাদা মিশ্রিত বালু ও লবণাক্ত বালু ব্যবহার করা হচ্ছে।
শিডিউলে ১ নম্বর ইট ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে গিয়ে প্রমাণ পাওয়া যায়, এ সব নিয়মকে তোয়াক্কা না করে নিম্নমানের ইটের খোয়া এবং জংধরা পুরাতন স্ক্র্যাপ মেটাল ব্যবহার করা হচ্ছে।
এমনকি সিঁড়ির রেলিংয়ে নতুন পাইপের বদলে জংধরা লোহা এবং জানালায়ও একই ধরনের পুরাতন লোহা ব্যবহার করা হয়েছে।
‘প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করেই অনিয়ম চালানো হচ্ছে’
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, জানাজার মাঠে আগে নির্মাণসামগ্রী রাখা হলেও বাধা দিলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আশ্বাস দিয়েছিল পরে মাঠ ভরাট করে টাইলস দিয়ে সংস্কার করা হবে। কিন্তু ভবনের প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হলেও এখনও মাঠ সংস্কার করা হয়নি।
এদিকে মঙ্গলবার (১২ মে) দ্বিতীয় দফা সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আল-আমিনের উপস্থিতিতে পাশের ছড়া থেকে নিম্নমানের কাদা মিশ্রিত বালু উত্তোলন করে কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ধারণা, প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করেই এই অনিয়ম চালানো হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, শুরু থেকেই নিম্নমানের বালুর সঙ্গে গুঁড়ো পাথর মিশিয়ে ছাদ ঢালাইয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে তারা বাধা দিলে কাজ বন্ধ হয়। পরে অভিযোগ করলেও এলজিইডি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, বরং ঠিকাদারকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
স্থানীয় যুবক সোহেলসহ একাধিক ব্যক্তি বলেন, অনিয়মের প্রমাণসহ ইউএনও ও উপজেলা প্রকৌশলী বনি আমিনকে জানানো হলেও পরে অভিযোগকারীদের নাম ফাঁস করে দেওয়া হয় এবং তাদের হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়।
হালিমের শ্বশুর বিএনপির নেতা হওয়ায় কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না বলেও তারা দাবি করেন।
তবে কোনো সুরাহা না করে উল্টো অভিযোগকারীদের নাম ফাঁস করে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এড়িয়ে যান বনি আমিন।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপপ্রচার বলে দাবি অভিযুক্তের
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্যাভিলিয়ন বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী ও ছাত্রলীগ নেতা হালিমুর রশিদ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, লোকসান হলেও ভবনের কাজ প্রায় শেষ এবং তা প্রকৌশল দপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তিনি অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অপপ্রচার বলে দাবি করেন।
বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মনিরুল আলম বলেন, জানাজার মাঠ থেকে মাটি কেটে ভবনের বেজ ভরাট করা হয়েছে এবং প্রতিবাদ করায় স্থানীয়রা মিথ্যা মামলা ও হুমকির শিকার হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, কাদা ও লবণাক্ত বালু ব্যবহারের ফলে ভবনের স্থায়িত্ব মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা এমরানসহ অনেকে জানান, ছড়ার বালু আলফাজ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে কিনে ব্যবহার করা হয়েছে। একইসঙ্গে জানাজার মাঠ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনও কোনো কাজ হয়নি।
চিকনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল আউয়াল বলেন, নির্মাণ কাজে লোকাল বালি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে এবং শ্রমিক সংকটের কারণে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিল। পরে উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের নির্দেশনায় শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালানো হয়। তিনি জানান, শিডিউল অনুযায়ী সিলেট স্যান্ড ব্যবহারের কথা ছিল।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার হালিমুর রশিদ বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে এবং বিলের একটি বড় অংশ এখনও তিনি পাননি।
তিনি বলেন, সব তথ্য উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের সঙ্গে কথা বললেই জানা যাবে।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও কোনো ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ব্যবহার করে কেউ দায় এড়াতে পারবে না।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আফতাবুর রহমান বলেন, কাদা ও লবণাক্ত বালু ব্যবহারে কংক্রিটের বন্ডিং স্ট্রেন্থ কমে যায় এবং জংধরা লোহা ব্যবহারে রড দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, যা ভবনের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। নিয়মিত কিউরিং না করলেও কংক্রিট প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন করতে পারে না।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মহেশখালী কার্যালয়ের প্রকৌশলী বনি আমিন জনি বলেন, অভিযোগের পর কিছু অনিয়ম আগেই রোধ করা হয়েছিল এবং ২০২৩ সালে শুরু হওয়া কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হয়েছে। তবে স্থানীয় বালু ও জংধরা লোহা ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।