রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
মাহাবুবুর রহমান মিঠুন, ঈশ্বরদী (পাবনা)
প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬ ০৯:৫৮ এএম
আপডেট : ১৪ মে ২০২৬ ১৫:৫৬ পিএম
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কল্যাণে আমূল বদলে গেছে রূপপুর-নতুনহাট এলাক। এখানে রাস্তাঘাট ও হাটবাজারে সার্বক্ষণিক পদচারণা এখন বিদেশি বিশেষ করে রুশ নাগরিকদের। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সন্ধ্যা নামলেই যেখানে শিয়ালের হাঁকডাক আর ধু-ধু অন্ধকারে ভয়ে শরীর কাঁপত, সেই রূপপুর এখন রাতের ঝলমলে আলো ও নানা পরিবর্তনে পরিণত হয়েছে যেন ‘একটুকরো রাশিয়া’য়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নে এখানে কর্মরত রয়েছেন প্রায় সাত হাজার রুশ নাগরিক, তাদের পদচারণায় বদলে গেছে এখানকার হাটবাজার ও দোকানপাট। সব মিলিয়ে রূপপুর প্রকল্পের কল্যাণে নিভৃত গ্রাম থেকে ব্যস্ত শহর হয়ে উঠেছে রূপপুর-নতুনহাট এলাকাটি।
প্রকল্পের পাশেই বিগত ব্রিটিশ আমলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে ১৯১০ সাল থেকে নির্মাণ শুরু হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের। সে সময়ই নির্মিত হয় দেশের প্রথম ও বৃহত্তম ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশন, পাকশী রেলওয়ে কার্যালয় ও কোয়ার্টারসহ নানা স্থাপনা। কয়েক বছরের ব্যবধানে চালু হয় নির্মাণাধীন বেশ কিছু প্রকল্প, যার অধিকাংশ এলাকা ছিল রূপপুর। মূলত এ কারণেই উন্নয়নের ছোঁয়াটা শুরু হয় রূপপুর থেকেই।
এদিকে ২০১৩ সালে রাশিয়ার সঙ্গে এই রূপপুর প্রকল্প নির্মাণের চুক্তি ও সর্বশেষ ২০১৬ সাল থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয় রূপপুর থেকেই। এতে দ্বিতীয় ধাপে আবারও পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে রূপপুরে। রূপপুর প্রকল্পের নির্মাণকাজের জন্য আসতে শুরু করেন রাশিয়ান নাগরিকরা। তাদের আবাসনের জন্য নতুনহাটের একটি জঙ্গল চরের বালিবেষ্টিত স্থানে তৈরি করা হয় বড় বড় দালান, যা এখন পুরো জেলার মধ্য সর্ব্বোচ্চ উচ্চ ভবনের তালিকায় রয়েছে। এসব দালানে বসতি শুরু করেন রাশিয়া থেকে আগত নাগরিকরা। শুধু রূপপুর-নতুনহাটই নয়, ধীরে ধীরে উপজেলার বিভিন্ন আবাসিক এলাকাতেও প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে আসা এসব রুশ নাগরিক বসতি গড়ে তোলেন। সময়ের পরিক্রমায় স্থানীয় গ্রামের মানুষের সঙ্গেও তৈরি হয় তাদের সখ্য। এসব রুশ নাগরিকের চাহিদা ও প্রয়োজনের তাগিদেই রূপপুর-নতুহাট এলাকায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন বিপণিবিতান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট, হাসপাতাল ও বিনোদনকেন্দ্র। কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মানুষের। সব মিলিয়ে বদলেছে নিভৃত এই রূপপুরের রূপ। শুধু তাই নয়, পার্শ্ববর্তী গ্রাম নতুনহাট, সাহাপুর ও দিয়াড় বাঘইল গ্রামগুলোও হয়ে উঠেছে এক আলো ঝলমলে ছোট্ট শহর।
গত ২৮ এপ্রিল এই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম সম্পন্নের মধ্য দিয়ে রূপপুর প্রকল্পের এক ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছে, যা পুরো বাংলাদেশকে বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এ যাত্রা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, বরং নতুন করে এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ধাপও বটে।
সম্প্রতি প্রকল্প এলাকাটি ঘুরে দেখা গেছে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এসব রুশ নাগরিক সেখানকার শপিংমল ও দোকানপাটগুলোতে কেনাকাটা করছেন। অনেকেই বিভিন্ন হোটেল-রেস্তোরাঁ ও চায়ের আড্ডায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের উপস্থিত রাখছেন। শুধু তাই নয়, প্রকল্প এলাকাসহ বাজার এলাকায় তাদের কথা চিন্তা করে তৈরি হয়েছে রাশিয়ান মার্কেট। এসব মার্কেট ও দোকানপাটের প্রতিটি সাইনবোর্ডে বাংলার পাশাপাশি রাশিয়ান ভাষা লেখা দেখে বোঝা যায় স্থানীয়দের অনেকেই রপ্ত করেছেন রুশ ভাষা। রাশানদের সঙ্গে রাশিয়ান ভাষায় কথা বলছেন দোকানিরাও। এসব কিছু দেখে বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক যে এটি আসলে বাংলাদেশ নাকি রাশিয়া!
নতুনহাট গ্রিনসিটির সামনের সবজি বিক্রেতা আব্দুল আজিজ বলেন, তাদের চাহিদার কথা চিন্তা করেই রুচিসম্মত সবজি বিক্রি করছি। প্রথম প্রথম তাদের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হলেও বর্তমানে তাদের অধিকাংশ ভাষাই আয়ত্তে এসেছে। আবার বাংলা ভাষাও তাদের আয়ত্তে। এ কারণে এখন আর কোনো সমস্যা হয় না।
গ্রিনসিটি ক্যাফের কর্মী আলিফ হোসেন ও রূপপুর ফল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী সাইফুল আলম জানান, রাশিয়ানরা মাছ-মাংসের চাইতে ফল, সবজি ও ফাস্টফুড বেশি খান। প্রথমে ঠিক বুঝতে পারতাম না তারা আসলে কী ধরনের জিনিস চান। এখন তাদের চাহিদা আর রুচির সঙ্গে মিল রেখেই ব্যবসা করতে পারছি। রাশিয়ান ভাষাও অনেকটাই আয়ত্তে এনেছি।
শুধুমাত্র রূপপুর প্রকল্পে কর্মরত এসব রুশ নাগরিকের কথা মাথায় রেখে উপজেলার জয়নগরে গড়ে উঠেছে স্বপ্নদ্বীপ রিসোর্ট। যার অভ্যন্তরে রাশিয়ার আদলে তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি বিনোদন স্পট। এই রিসোর্টের মালিক খাইরুল ইসলাম বলেন, আমাদের ঈশ্বরদী যে এমন বিদেশি নাগরিকদের অবাধ বিচরণের শহর হবে তা কখনও কল্পনাতেও ছিল না। মূলত তাদের কথা ভেবেই আমি এই রিসোর্ট তৈরি করেছি, যেখানে দিনের ২৪ ঘণ্টাই রুশ নাগরিকদের উপস্থিতি থাকে। এই রিসোর্ট বর্তমানে ঈশ্বরদীসহ পুরো জেলার একটি অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক তথ্য কর্মকর্তা মো. সৈকত আহমেদ বলেন, এই রূপপুর প্রকল্প ঈশ্বরদী নয়, পুরো বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই এলাকাটি ছিল জঙ্গলময়। এখানকার মানুষ ভাবতেও পারেনি তাদের এলাকাটি এত উন্নত হবে। আমি মনে করি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই যাত্রার মধ্য দিয়ে পুরো ঈশ্বরদী একদিন বিশ্বদরবারে স্থান করে নেবে।