× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

রসনা বিলাসে সিলেটের ঐতিহ্য ‘সাতকরা’

ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬ ১৬:৫০ পিএম

সাতকরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সাতকরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

‘হাতকরাদি (সাতকরা দিয়ে) চিনার (সিনার) হাড্ডি (হাড়) রাইনছইন (রান্না করছেন) তোমার বিয়াইনে, ও বিয়াইন সাব তাক (থাকো) তুমি খাইয়া যাইবায় মাদানে (দুপুরে); মাথা আমার আউলা অই যার হাতকরার ও গেরানে (ঘ্রাণে), ফুল হুকুইনদি (শুটকি) উড়ি (সীম) কদু (লাউ) অলান মজা (খুব মজা বা স্বাদ) লাগেরে...’। সিলেটের একটি জনপ্রিয় আঞ্চলিক এই দ্বৈত গানেই সাতকরা দিয়ে গরুর মাংশ বিশেষ করে গরুর সিনার হাড় রান্না করলে যে মজাদার খাবার হয় সে বিষয়ে বিশদ বর্ণনা বিদ্যমান।

৩৬০ আওলিয়ার পূণ্যভূমি বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রায় এক কোটি মানুষের খাদ্য তালিকায় বাড়তি চাহিদার নাম হলো সাতকরা। সিলেটিদের রন্ধন তালিকায় প্রাত্যহিক রান্নায় বিশেষ করে মাংস জাতীয় তরকারি রান্নায় সাতকরা যেন অপরিহার্য এক অংশ। এটি ছাড়া অধিকাংশ সিলেটি’র রসনা বিলাসই যেন থেকে যায় অসম্পূর্ণ।

বড় মাছ ও মাংস জাতীয় তরকারিতে সুঘ্রাণ ও ভিন্ন স্বাদের জন্য সাতকরা ব্যবহৃত হয়ে আসছে সিলেট বিভাগের চার জেলা মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও সিলেটে। ঢাকা ও চট্টগ্রামেও রয়েছে এর চাহিদা।


দেশের অন্যান্য জেলায় সাতকরা নামের ঐতিহ্যবাহী লেবু জাতীয় এ ফলটি পাওয়া যায় কালেভদ্রে। সিলেট অঞ্চলের প্রতিটি শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, এ ফলের কদর ও চাহিদা ব্যাপক। সিলেটি অধিবাসীদের কাছে সাতকরা যেন এক অমৃত। সাতকরা ছাড়া তরকারি, বিশেষ করে মাংস রান্না করলে একপ্রকার অতৃপ্তি যেন থেকে যায়।

সিলেটিদের কাছে সাতকরার চাহিদা সারা বছরই থাকে। তবে প্রতি বছর কোরবানি ঈদ আসলেই চাহিদা ও কদর বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সে সময়ে চড়া দামে বাজারে বিক্রি হয় ফলটি। দেশ ছাড়াও এই ফলের কদর আছে বিদেশেও। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন পেশার কারণে বসবাসরত বৃহত্তর সিলেটের বাসিন্দারা কাঁচা অথবা রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা সাতকরা নিয়ে যান। 

বছর কয়েক আগেও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সাতকরা চাষবাদ হতো। পৃষ্ঠপোষকতা ও নানা কারণে বর্তমানে এটির চাষাবাদ অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। তবে কিছু কিছু চাষি ঐতিহ্যবাহী এ ফলটির চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাতকরার ইতিহাস

সিলেট অঞ্চলের সুদীর্ঘকালের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথেও এই ফলের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আঠারো শতকে সিলেটের সীমান্তের ওপারে ভারতের আসাম রাজ্যে ব্যাপকভাবে সাতকরা চাষ হতো। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সাতকরা চাষ শুরু হয় বৃহত্তর সিলেটের পাহাড়ি এলাকায়।

কমলা লেবুর মতো সাতকরার গাছ আকারে লম্বা ও বড় হয়। বর্তমানে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সিলেট জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে কিছু কিছু সাতকরা চাষ হয়ে থাকে। এ তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাতকরা চাষ হয় সিলেট জেলায়। 

সাতকরা গাছ

বর্তমানে ‘পাতলা’ ও ‘ছেলা’ নামে দু’প্রকারের সাতকরা বাজারে পাওয়া যায়। রান্নার উপাদান ছাড়াও সাতকরা ব্যবহৃত হয় আচার তৈরিতে। সাতকরার আচার দেশের গন্ডি পেরিয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাঙালীদের প্রিয় খাবার। 

ঈদুল আযহায় দাম বাড়ে কয়েকগুণ

মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সাতকরা চাষি মো. আব্দুল কাইয়ুম জানান, সিলেটিদের খাদ্য তালিকায় সাতকরা অনন্য নাম হলেও বর্তমানে চট্টগ্রামবাসীর অনেকের খাদ্য তালিকাতেও সাতকরা স্থান করে নিয়েছে।

তিনি জানান, তার বাগানে উৎপাদিত সাতকরার অল্প সংখ্যক স্থানীয়ভাবে বাজারজাত করা হয়। বেশীরভাগ সাতকরা চট্টগ্রাম থেকে পাইকাররা এসে নিয়ে যান। এছাড়া ঢাকা ও রাজশাহী এলাকার পাইকাররা সাতকরার বড় ক্রেতা। বর্তমানে প্রতি হালি পাইকারি সাতকরা বিক্রি হচ্ছে সাইজভেদে ১৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত।

মো. আবুল মিয়া নামের অপর এক চাষি জানালেন মৌসুমে এসব গাছের সবগুলো সাতকরা সিলেটের একটি খাদ্য ও আচার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়ে যায়। তার কাছ থেকে কিনে নেয়া সাতকরা দিয়ে ওই প্রতিষ্ঠান আচার তৈরি এবং তা বোতলজাত করে বাজারে বিক্রি করছে। তার জানা মতে ওই প্রতিষ্ঠান এলাকার আরো ৫-৭ জন চাষির কাছ থেকে সাতকরা কিনে সংগ্রহ করে।

মৌলভীবাজার জেলার প্রায় প্রতিটি বড় হাট বাজারে সাতকরা বিক্রি হয়ে থাকে। এ অঞ্চলে সাতকরার সবচেয়ে বড় হাট হচ্ছে সিলেট জেলার সদর উপজেলা। যদিও এসব সাতকরার বেশরভাগই আমদানি করা। সিলেটের অনেক স্থানেই সাতকরার হাট বসলেও মৌসুমে নিত্যদিন পাইকারি ও খুচরা সাতকরার হাট বসে সিলেট শহরের বন্দরবাজারে। এখানে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সাতকরা বিক্রি হয়। প্রায় শতাধিক ব্যবসায়ী এখানে সাতকরার ব্যবসা করেন। 

সাইজভেদে প্রতিটি সাতকরা বিকি হয় ৪০ থেকে ১২৫ টাকা পর্যন্ত

কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে বর্তমানে মৌলভীবাজার ও সিলেটে প্রতিটি সাতকরার বাজার মূল্য সাইজভেদে ৪০ টাকা থেকে ১২৫ টাকা পর্যন্ত। তবে ঈদ-উল-আযহার পর বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা।

শ্রীমঙ্গলের সাতকরার খুচরা বিক্রেতা মারজান বলেন, “বর্তমানে বাজারে সাতকরার প্রচুর দাম। অনেক পুঁজি লাগে এ ব্যবসায়। সে তুলনায় লাভ করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। আমি সিলেট থেকে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৫০টি সাতকরা এনছিলাম ২৫ হাজার টাকা দিয়ে। গড়ে কেনা পড়েছে প্রতি পিস ৫৬ টাকা। এর উপর পরিবহন খরচ, বাজারের তোলামুঠি (খাজনা) দিয়ে লাভ খুব কম হবে। ছোট সাইজেরগুলো বিক্রি করতে পারছি ৫০ টাকা পিস দামে। তবে বড় সাইজেরগুলো প্রতি পিস ১২৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি। ঈদের কারণে পাইকারি বাজারেই অনেক বেশি দাম। ঈদের পর আশা করছি দাম অনেকটাই নাগালে আসবে”।

মৌলভীবাজার শহরের বর্ষিজোড়া এলাকার বাসিন্দা শরিফা বেগম বলেন, “আমার বাবার বাড়ি সিলেটের কানাইঘাটে। স্বামীর বাড়ি মৌলভীবাজার। এই দুই জেলাসহ পুরো সিলেট অঞ্চলের রীতি হলো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোন অতিথি আমাদের এলাকায় বেড়াতে আসলে আমরা অতিথিদের সাতকরার মাংসের তরকারি দিয়ে আপ্যায়ন করি। সাতকরা দিয়ে রান্না করা তরকারি হলো সিলেটিদের ঐতিহ্যের অংশ”।

সাতকরা যে শুধু সুস্বাদু তরকারি তা নয়। এ ফলটি স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ উপকারী। ফলটিতে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস। বাত, শিরা-উপশিরা ব্যাথায় যারা ভূগছেন তারা সাতকরা খেলে এসব রোগ থেকে উপশম পেতে পারেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা