হাওরাঞ্চলে কোনো কোনো কৃষক ঘরে ধান তুলতে পারলেও রোদ না থাকায় খড় শুকাতে পারেননি। ভেজা খড়ে পচন ধরে তা এখন পশুখাদ্যের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
“ফসল গেল, এবার গরুগুলারে ক্যামনে বাঁচামু?”—এই প্রশ্ন এখন হাওরাঞ্চলের কৃষক-খামারিদের মুখে মুখে ঘুরছে।
অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে কিশোরগঞ্জসহ হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে শুধু বোরো ধানই নয়, গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য খড়ও মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়ে গেছে।
ফলে খাদ্য সংকটে গরু মোটাতাজাকরণ কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে, আর আসন্ন কোরবানির বাজার নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার কৃষক মোহাম্মদ আমিরের মতো হাজারো কৃষকের এখন একই অবস্থা।
‘খাওয়ানোর মতো নেই এক মুঠো শুকনো খড়’
হাওরের দিগন্তজোড়া মাঠ এখন পানির নিচে। যে খলায় ধান মাড়াইয়ের কথা ছিল, সেখানে পচা খড়ের দুর্গন্ধ।
গোয়ালঘরে বাঁধা তিনটি গরু ক্ষুধায় বারবার ডাকছে, কিন্তু খাওয়ানোর মতো এক মুঠো শুকনো খড়ও নেই।
আমির মিয়া হতাশ হয়ে বলেন, “একেতো ধান হারাইয়া সব গেছে, এখন সংসারের শেষ সম্বলও যাবে। আবার গরু খাওয়াতেও পারতেছি না, শেষ পর্যন্ত খড়ের অভাবে গরু বিক্রি কইরা দিতে অইবো।”
বেড়েছে খড়, ভুষি ও খৈলের দাম
হাওরাঞ্চলের কৃষি বাস্তবতায় ধান শুধু মানুষের খাদ্য নয়, বরং গবাদিপশুর সারা বছরের প্রধান খাদ্য খড়ের উৎস। বোরো মৌসুমে ধান কেটে খড় শুকিয়ে মাচায় সংরক্ষণ করা হয়। সেই খড় দিয়েই বছরের বড় অংশ জুড়ে গরু-মহিষ পালন চলে।
কিন্তু এবার টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হয়নি। ফলে অর্ধেকের বেশি খড় পানিতে ডুবে পচে গেছে।
যারা ধান কাটতে পেরেছেন, তারাও রোদ না থাকায় খড় শুকাতে পারেননি। ভেজা খড়ে পচন ধরে তা এখন পশুখাদ্যের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
এদিকে হাওরের পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে থাকায় গবাদিপশু চড়ানোর মতো কোনো শুকনো জমি নেই। ঘাসও জন্মাচ্ছে না। ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে অল্প পরিমাণ বিকল্প খাদ্য দিয়ে গরু বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
তবে বাজারে খড়, ভুষি ও খৈলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় গরু পালন এখন লোকসানের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
কোরবানির বাজারে দেশীয় গরুর সরবরাহ কমে যাওয়ার শঙ্কা
খামারিরা জানান, খাদ্য সংকটের কারণে গরুর ওজন কমে যাচ্ছে। পুষ্টিহীনতায় পশুর স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। ফলে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করার যে পরিকল্পনা ছিল, তা ব্যাহত হচ্ছে।
অনেকেই বাধ্য হয়ে কম বয়সি গরু আগেভাগে বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে ভবিষ্যতে কোরবানির বাজারে দেশীয় গরুর সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অষ্টগ্রামের আব্দুল্লাহপুর এলাকার খামারি মামুন মিয়া বলেন, প্রতিবছর বোরো মৌসুমে খড় আমাদের বড় ভরসা ছিল। কিন্তু এবার অধিকাংশ খড় নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বাজার থেকে কিনতে হচ্ছে, কিন্তু দাম প্রায় দ্বিগুণ।
তিনি বলেন, “এত দামে খড় কিনে গরু পালন করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে গেছে। বাজারেও পর্যাপ্ত খড় পাওয়া যাচ্ছে না।”
‘আমাগো সব স্বপ্ন পানিতে তলাইয়া গেছে’
নিকলীর ছাতিরচরের কৃষাণী সফুরা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমাগো সব স্বপ্ন পানিতে তলাইয়া গেছে। ধানও তুলতে পারি নাই, খড়ও নাই। এখন গরুগুলারে কি খাওয়ামু বুঝি না।”
তিনি জানান, বাধ্য হয়ে অনেকেই গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন, কিন্তু বাজারে দামও খুব কম পাওয়া যাচ্ছে।
ইটনার বড়িবাড়ি গ্রামের রাশিদা বেগম বলেন, তার দুইটি গাভী ছিল সংসারের মূল ভরসা। দুধ বিক্রি করে সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চলত। কিন্তু এখন খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় গাভীর দুধ উৎপাদন কমে গেছে।
তিনি বলেন, “দুধ বিক্রি করে যা পাই, তার চেয়ে খাবারের খরচ বেশি। এখন গরু রাখব নাকি বিক্রি করব বুঝতেছি না।”
‘পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হবেন খামারিরা’
মিঠামইনের খামারি আলাল মিয়া জানান, দুধের দাম না বাড়লেও পশুখাদ্যের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে গরু পালন করে লাভের পরিবর্তে লোকসান হচ্ছে।
তিনি আশঙ্কা করেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে অনেক খামারি পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হবেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, হাওরে খড়ের উৎপাদন এবার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। যা কিছু উৎপাদন হয়েছে, তার বড় অংশই পচে গেছে। ফলে দেশের অন্যান্য জেলা থেকে খড় আনতে হচ্ছে।
এতে পরিবহন খরচ যোগ হয়ে দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি খামারিদের ওপর পড়ছে, বলেন তারা।
খামারিরা জানান, পশুখাদ্যের পাশাপাশি ওষুধ ও পরিচর্যার খরচও বেড়েছে।
তারা বলেন, কেউ কেউ পুরো খামার ছোট করছেন, আবার কেউ পশুপালন থেকে সরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এতে কোরবানির বাজারে গরুর সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
অষ্টগ্রামের গরু ব্যবসায়ী নবী হোসেন বলেন, এবার খামারিরা সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে আছেন। খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা গরু যথাযথভাবে মোটাতাজা করতে পারছেন না। ফলে কোরবানির সময় বাজারে গরুর দাম বাড়তে পারে।
স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ, সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি বৃদ্ধির দাবি খামারিদের
তবে খামারিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংকট চললেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর সহায়তা আসেনি। পশুখাদ্য, খড় ও ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই বলে তারা জানান।
তারা জরুরি ভিত্তিতে গোখাদ্য সহায়তা, খড় সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা, স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ, সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি পশুচিকিৎসা সহায়তা বাড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছেন।
ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞ ডা. এ বি এম জালাল উদ্দিন বলেন, খড় সংরক্ষণ ব্যবস্থা আধুনিক না করলে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ হবে। বিকল্প গোখাদ্য উৎপাদন ও দুর্যোগকালীন সহায়তা জরুরি বলে তিনি মত দেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জে এবার প্রায় এক লাখ ৫২ হাজার পশুর চাহিদা রয়েছে, আর উৎপাদনের লক্ষ্য প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার।
অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হলেও খড় ও খাদ্য সংকট বাস্তব পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, অতিবৃষ্টিতে ধানের পাশাপাশি খড়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে সাময়িক খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
কৃষকদের বিকল্প খাদ্য ও ঘাস চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সব মিলিয়ে হাওরে এখন শুধু ধান রক্ষার লড়াই নয়, গরু বাঁচানোর সংগ্রামও চলছে।
পানির নিচে ডুবে থাকা মাঠ আর ক্ষুধার্ত গবাদিপশুর দিকে তাকিয়ে কৃষকদের একটাই প্রশ্ন—“ফসল গেল, এবার গরুগুলারে কেমনে বাঁচামু?”