বান্দরবানের থানচিতে শিক্ষকদের বেতন জোগাতে ছুটির দিনে নৌকা চালান প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বান্দরবানের থানচির দুর্গম তিন্দু ইউনিয়নে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে চলছে এক অভিনব সংগ্রাম।
এলাকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মাসিক বেতন দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই শিক্ষকদের বেতন জোগাতে ছুটির দিনে পর্যটকদের ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালান খোদ প্রধান শিক্ষক।
নিরহংকারী বামং খিয়াং মিংলেনের এই অক্লান্ত শ্রমে পাহাড়ের বুকে টিকে আছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি, আর শিক্ষকরাও পাচ্ছেন ন্যূনতম পারিশ্রমিক।
জেলা সদর থেকে প্রায় ৮৮ কিলোমিটার দূরে অবহেলিত এই জনপদে ২০২০ সালে স্থানীয়দের চেষ্টায় গড়ে ওঠে তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। ওই বছরই এমবিএ ডিগ্রিধারী বামং খিয়াং প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০২১ সালে স্থাপনের অনুমোদন ও ২০২৩ সালে স্বীকৃতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানটিতে এখন ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৫৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। অর্থাভাবে পূর্ণাঙ্গ জনবল নিয়োগ দেওয়া যায়নি; বর্তমানে ছয়জন শিক্ষক নামমাত্র বেতনে ও দুজন বিনাবেতনে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন আদায় প্রায় অসম্ভব একটি বিষয়। এই বাস্তবতায় উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া একটি নৌকায় প্রতি শুক্র, শনি ও সরকারি ছুটির দিনে থানচি থেকে তিন্দু বড়পাথর ও রেমাক্রী রুটে পর্যটক পরিবহন করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘অন্য চালক রাখলে মজুরি দিতে হয় এবং আয়ের স্বচ্ছতা থাকে নাÑ এ কারণে নিজেই নৌকার হাল ধরেছি।’ সুফলও মিলেছে হাতেনাতে; গত মার্চ-এপ্রিলে পর্যটক পরিবহন করে আয় হওয়া ৪৯ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে ৩০ হাজার টাকাই শিক্ষকদের বেতন হিসেবে দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সাঙ্গু নদী পার করে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে স্কুলে আনা-নেওয়ার দায়িত্বও নিজ কাঁধেই তুলে নিয়েছেন তিনি।
তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পাওয়াই ম্রো এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রধান শিক্ষক হয়েও বামং খিয়াংয়ের কোনো অহংকার নেই, তিনি নৌকা চালিয়ে যা আয় করেন, তা সব শিক্ষকদের মধ্যে সমান হারে বণ্টন করে দেন। তা দিয়েই আমরা কোনো রকম সংসার চালাচ্ছি আর শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে যাচ্ছি। বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেওয়াই মারমা বলেন, ‘বিদ্যালয়ের হেডস্যার আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করছেন; আমরা তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই।’
বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও তিন্দু ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মংপ্রু অং মারমার মতে, একসময় ইউনিয়নের টোলের টাকায় শিক্ষকদের বেতন হলেও এখন প্রধান শিক্ষকের চালানো নৌকার আয়েই প্রতিষ্ঠানটি কোনোরকমে টিকে আছে।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, টেকসই আয়ের জন্যই মূলত বিদ্যালয়টিকে নৌকাটি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা পরিষদের মাধ্যমে বিদ্যালয়টির ভবন নির্মাণ ও ছাত্রাবাস সংস্কারের কাজ চলছে।
ছাত্রাবাসে খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশাবাদী প্রধান শিক্ষক। দুর্গম পাহাড়ে একজন শিক্ষকের এমন নিঃস্বার্থ উদ্যোগ প্রমাণ করে, সদিচ্ছা ও অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব। বামং খিয়াংয়ের এই নিরলস শ্রম পাহাড়ের বুকে শিক্ষার একটি স্থায়ী বাতিঘর হয়েই থাকবে।