মো. উসমান গনি। ফাইল ছবি
রেলে চাকরি করেন, মাস শেষে সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত বেতনও তোলেন; অথচ দিনের পর দিন কর্মস্থলে তাকে দেখেন না সহকর্মীরা। হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর থাকলেও বাস্তবে তিনি ‘নিখোঁজ’। কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের এই কর্মচারীর নাম মো. উসমান গনি। অভিযোগ উঠেছে, অদৃশ্য কোনো এক ‘আলাদিনের চেরাগ’ হাতে পেয়েছেন তিনি, যার জোরে কাজ না করেই ভোগ করছেন রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা।
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এক চাঞ্চল্যকর দৃশ্য। হাজিরা খাতায় ১১ মে-এর ঘরের পাশাপাশি পরবর্তী দিন অর্থাৎ ১২ মে-এর ঘরেও অগ্রিম স্বাক্ষর মো. উসমান গনির। রেলওয়ের বিধি অনুযায়ী, প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হয়ে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, উসমান গনি একদিন আগেই পরের দিনের ডিউটি ‘সম্পন্ন’ দেখিয়ে রেখেছেন।
পয়েন্টসম্যান (পি-ম্যান) পদের কর্মচারী উসমান বর্তমানে জেলা রেলওয়ে শ্রমিক-কর্মচারী দলের আহ্বায়ক পদে আসীন। অভিযোগ রয়েছে, এই দলীয় পরিচয়ের আড়ালে রেলওয়ের বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধভাবে দোকান বরাদ্দের মতো লাভজনক খাতগুলো তার ইশারায় নিয়ন্ত্রিত হয়। এমনকি নিয়োগ ও পদোন্নতিতেও তার ‘অলিখিত’ হস্তক্ষেপের গুঞ্জন দীর্ঘদিনের।
রেলওয়েকে বলা হয় সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ বাহন। একজন যাত্রী যখন টিকিট কেনেন, তখন তিনি তার জীবনের নিরাপত্তা ওই সংস্থার ওপর ন্যস্ত করেন। কিন্তু যখন দায়িত্বশীল কর্মচারীরাই হাজিরা জালিয়াতি ও দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন, তখন সাধারণ যাত্রীদের মনে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রেলওয়ের প্রতিটি কাজ ‘চেইন অব কমান্ড’-এর মতো। পয়েন্টসম্যান বা সিগন্যালিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে একজন কর্মচারীর অনুপস্থিতি বা গাফিলতি বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
রাকিব হোসেন নামের এক যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একজন কর্মচারীর এই দুঃসাহস একা তৈরি হয় না। এর পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা কাজ করছে। জালিয়াতির মাধ্যমে ফায়দা লুটার এই প্রবণতা রোধ করা না গেলে রেলওয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, উসমান গনি একসময় জেলা রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন। তবে গত বছরের ২৮ এপ্রিল ভোল পাল্টে তিনি জেলা রেলওয়ে শ্রমিক-কর্মচারী দলের আহ্বায়ক পদ বাগিয়ে নেন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এই দলবদল এবং পদ প্রাপ্তি নিয়ে সাধারণ রেল কর্মচারীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই রাজনৈতিক পদটিকেই তিনি ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে অফিস ফাঁকি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সহকর্মী বলেন, “উসমান ভাই অফিসে এলেন কি না তাতে কিছু যায় আসে না। ওপর তলার কর্মকর্তাদের সাথে তার এমন সখ্যতা যে, তার স্বাক্ষর ঠিকই সময়মতো খাতায় পড়ে যায়। তার হাতে যেন সত্যি কোনো জাদুকরী চেরাগ আছে।”
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মো. উসমান গনির বক্তব্য জানতে তার কর্মস্থলে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনও সাড়া মেলেনি।
কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার খলিলুর রহমান জানান, “ডিউটি না করে হাজিরা খাতায় অগ্রিম স্বাক্ষর করা সরকারি চাকরির বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তারা প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের-২ ঢাকা সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু রায়হানের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে এবং বর্তমানে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়াটি চলমান।”