যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাব
রয়টার্স
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬ ১০:৩৩ এএম
আপডেট : ১১ মে ২০২৬ ১১:৫০ এএম
ইরানের তেহরানে হরমুজ প্রণালি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে ৮ মে তৈরি একটি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিলবোর্ডের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবি: রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাবের জবাবে ইরানের দেওয়া প্রতিক্রিয়াকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তার এই দ্রুত প্রত্যাখ্যানের পর সোমবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়।
এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, টানা ১০ সপ্তাহ ধরে চলা সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল অচলই থেকে যেতে পারে।
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি ইরানের
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল।
এর জবাবে রোববার ইরান এমন একটি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে, যেখানে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের ওপর জোর দেওয়া হয়।বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সংঘাত বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
তেহরান যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের বিষয়টিও জোর দিয়ে উল্লেখ করেছে, বলে জানায় টেলিভিশনটি।
আধা-সরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর হামলা না করার নিশ্চয়তা দিতে বলেছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানি তেল বিক্রির ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ার পর বেড়েছে তেলের দাম
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি লেখেন, “আমি এটা পছন্দ করিনি—এটা পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।” তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ছিল, প্রথমে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে। এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করা হবে।
ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ার পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৩ ডলার বেড়ে যায়।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। বর্তমানে এই জলপথ যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাপের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
এখনও অস্পষ্ট পরবর্তী পদক্ষেপ
বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না।
কারণ হিসেবে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সম্মুখীন হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশিত সমর্থন পায়নি। পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি ও আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট ছাড়া হরমুজ প্রণালি খুলতে নৌবাহিনী পাঠানোর প্রস্তাব ন্যাটো মিত্ররা প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে কূটনৈতিক বা সামরিকভাবে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের বেইজিংয়ে যাওয়ার কথা বুধবার
ট্রাম্পের বুধবার বেইজিং সফরের কথা রয়েছে। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ইরান ইস্যু প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে তেহরানের ওপর প্রভাব খাটাতে চীনেকেও চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অভিযান শেষ হয়েছে কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প রবিবার সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “তারা পরাজিত হয়েছে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে তাদের সব শেষ হয়ে গেছে।”
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও বলেছেন, যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি।
তার মতে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া, পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস এবং ইরানের প্রক্সি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা মোকাবেলার জন্য ‘আরও কাজ বাকি আছে’।
সিবিএস নিউজের ‘সিক্সটি মিনিটস’ অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরানোর সবচেয়ে ভালো উপায় কূটনীতি। তবে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
ইরান কখনও শত্রুর কাছে মাথা নত করবে না: ইরানের প্রেসিডেন্ট
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরান কখনও শত্রুর কাছে মাথা নত করবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তেহরান কঠোর অবস্থানে থাকবে।
যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ চললেও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অস্থির রয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত রবিবার জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা দুটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
কাতারও একই ধরনের অভিযোগ করে জানিয়েছে, তাদের জলসীমায় একটি কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলা হয়েছে।
কুয়েত অভিযোগ করেছে, তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া শত্রু ড্রোন প্রতিহত করা হয়েছে।
ইরানের সক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করছে ইসরায়েল, স্বীকার নেতানিয়াহুর
গত ১৬ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শেষ হলেও লেবাননের যুদ্ধ শেষ হবে— এমন নিশ্চয়তা নেই।
তিনি আরও স্বীকার করেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতাকে প্রথমে ইসরায়েলের পরিকল্পনাকারীরা অবমূল্যায়ন করেছিলেন।
তার ভাষায়, “ঝুঁকিটা কত বড়, সেটা বুঝতে তাদের কিছুটা সময় লেগেছে।”