পিয়াল হাসান রিয়াজ, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ : ০৬ মে ২০২৬ ২১:৫৪ পিএম
প্রতীকী ছবি
ঘড়ির কাঁটায় মধ্যরাত ছুঁইছুঁই। নবীনগর পৌর এলাকার একটি নির্জন গলিতে হঠাৎ থামে একটি মোটরসাইকেল। চারপাশে সজাগ দৃষ্টি, নিচু স্বরে সংক্ষিপ্ত কথোপকথন। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন তরুণ এগিয়ে আসে। অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে আসে এক নারী—স্থানীয়দের কাছে পরিচিত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে। মুহূর্তেই হাতবদল হয় ছোট একটি প্যাকেট। ভেতরে ইয়াবা ট্যাবলেট।
কয়েক সেকেন্ডের এই লেনদেন শেষে সবাই দ্রুত সরে পড়ে। যেন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু বাস্তবতা হলো-এই নীরব, অদৃশ্য লেনদেনই ধীরে ধীরে গ্রাস করছে পুরো নবীনগরকে।
মাদকমুক্ত করার কঠোর নির্দেশনা, প্রশাসনিক হুঁশিয়ারি আর নিয়মিত অভিযানের ঘোষণার মাঝেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাদক সিন্ডিকেট। অনুসন্ধানে জানা গেছে, পৌর এলাকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা এখন ইয়াবা, গাঁজা ও স্কপ সিরাপের অবাধ বাজারে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রিত মনে হলেও রাত নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মাদক কারবারিরা।
সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে ১৪৩ পিস স্কপ সিরাপ, ১৭৪ পিস ইয়াবা, ১১ কেজি গাঁজা এবং প্রায় ৮০ কেজি চোলাই মদ জব্দ করা হয়েছে। তবে এলাকাবাসীর দাবি, এসব উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্য বৃহৎ নেটওয়ার্কের খুবই ক্ষুদ্র অংশমাত্র। তাদের অভিযোগ—মাদক ব্যবসার মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
পৌর এলাকার নারায়ণপুর দক্ষিণ-পূর্ব পাড়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একাধিক মাদক স্পট। এসব স্পটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অদৃশ্য অপরাধ সাম্রাজ্য। স্থানীয়রা জানান, কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়ে তারা নিজেরাই কিছু স্পট গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। বরং প্রতিবাদকারীদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। রাতের আঁধারে বাড়িতে চুরির ঘটনাও বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা নিজেরাই কয়েকটা স্পট ভেঙে দিয়েছি। কিন্তু পরে উল্টো আমাদেরই হুমকি দেওয়া হয়েছে। এখন কেউ মুখ খুলতে চায় না।”
অভিযোগ রয়েছে, এই চক্র শুধু মাদক ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়; চুরি, ছিনতাই, দেহব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডেও তারা জড়িত। সম্প্রতি মাদক কেনাবেচার সময় এলাকাবাসীর হাতে এক ব্যবসায়ী আটক হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে কিছু গোপন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে এলাকায় নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে পৌরসভার কোনাঘাট ঋষি পাড়ায় প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে চোলাই মদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে প্রতিদিন শত শত লিটার মদ উৎপাদন করা হলেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি কোনো প্রভাব ফেলছে না বলেই দাবি এলাকাবাসীর।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “অভিযান হয়, আবার কিছুদিন পর সব আগের মতোই শুরু হয়ে যায়। এতে মনে হয়, এগুলো শুধু লোক দেখানো কার্যক্রম।”
তবে পুলিশ বলছে, তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে।
থানার সূত্র জানায়, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত ১৬টি মাদক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, “মাদক সেবী অথবা ব্যবসায়ী-হয় মাদক ছাড়বে, নয়তো নবীনগর ছাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “মাদক নির্মূলে পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” এ বিষয়ে তথ্য দিয়ে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ (নবীনগর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান বলেন, “মাদক কারবারি ও সেবী—কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। নবীনগরকে মাদকমুক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও জানান, মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এদিকে প্রশাসনের উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে মাদকবিরোধী সমাবেশ, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও প্রচারণা চালানো হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলেই দাবি এলাকাবাসীর।