ইসমাইল মাহমুদ, মৌলভীবাজার
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬ ১১:১৫ এএম
আপডেট : ০৪ মে ২০২৬ ১১:২০ এএম
তালগাছ সংকটে নারিকেল গাছে বাসা বেঁধেছে বাবুই পাখি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কবি রজনীকান্ত সেন তার বিখ্যাত কবিতা ‘স্বাধীনতার সুখ’-এ লিখেছেন- বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, “কুঁড়েঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই, আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে”, বাবুই হাসিয়া কহে “সন্দেহ কি তায়? কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়।”
দেশের আবহমান বাংলার গ্রামে-গঞ্জে এক সময় উঁচু তালগাছে বাবুই পাখিদের দৃষ্টিনন্দন বাসা প্রচুর পরিমাণে দেখা যেত। কালের বিবর্তনে, পরিবেশের বিপর্যয়ে এবং বাবুই পাখিদের বাসা তৈরির অন্যতম স্থান তালগাছ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় বর্তমান সময়ে তাদের মনোমুগ্ধকর শৈল্পিক বাসা হারিয়ে যেতে বসেছে। এখন আর গ্রামেগঞ্জে খুব একটা শোনা যায় না বাবুই পাখিদের কলরব আর কিচির-মিচির শব্দ। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের দেশের পরিবেশ-প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বাবুই পাখি- এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
সারা দেশের মতো চায়ের রাজধানী ও পর্যটন নগরী হিসেবে খ্যাত মৌলভীবাজারেও ক্রমশ কমছে তালগাছের সংখ্যা, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে কমছে বাবুই পাখি ও তাদের শৈল্পিক বাসা। তবে এখনও যে পরিমাণ বাবুই পাখি এ জেলায় টিকে রয়েছে সে তুলনায় তালগাছ আর অবশিষ্ট নেই। ফলে তালগাছের সঙ্কটে জেলার বিভিন্ন স্থানে বাবুই পাখিরা সংসার পেতেছে নারিকেল গাছে।
জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়নের ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক সমিরণ হাজরা এবং রাজনগর উপজেলার ২ নম্বর উত্তরভাগ ইউনিয়নের হলদিগুল গ্রামে কৃষক মো. আইয়ুব আলীর বাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে নারিকেল গাছে অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা। এ দুটি স্থানসহ অপরাপর স্থানে নারিকেল গাছে বাবুই পাখিদের বাসা দেখতে প্রতিদিনই ছুটে আসছেন মানুষজন।
বাবুই পাখিদের সম্পর্কে ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক সমিরণ হাজরা বলেন, “বাগানে আমাদের বাসার সামনের অংশে একটি নারিকেল গাছে গত কয়েক বছর ধরে বাবুই পাখিরা বাসা তৈরি করছে। আমার পরিবার ডাব বা নারিকেল গাছ থেকে এমনভাবে পেড়ে আনি যেন গাছের বাবুই পাখিদের সমস্যা হয় না। অনেকে আমার বাসায় আসেন পাখিদের ও তাদের সুন্দর বাসাগুলো দেখতে। অনেকে ছবি ও ভিডিও করে নেন।”
রাজনগরের হলদিগুল গ্রামের আইয়ুব আলী বলেন, “এ বছর প্রথমবারের মতো আমার বাড়ির একটি নারিকেল গাছে বাবুই পাখিরা মোট ১১টি বাসা করেছিল। এ বছরের প্রচন্ড ঝড়-তুফানে ৫টি বাসা পড়ে গেছে। এসব পাখিদের দেখতে অনেক মানুষ আসেন।”
প্রবীণ শিক্ষাবিদ সুবিনয় পাল বলেন, “এক সময় আমাদের দেশে প্রচুর বাবুই পাখি ও প্রায় প্রতিটি তালগাছে বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। প্রতিটি গ্রাম মুখর থাকতো বাবুই পাখিদের সুমিষ্ট কলরবে। কিন্তু আমাদের দেশে একদিকে কমছে তালগাছের সংখ্যা, অন্যদিকে কমছে বাবুই পাখিও। এখন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেও বাবুই পাখিদের বাসা দেখা পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। শুধু বাবুই পাখি নয়, আমাদের পরিবেশ-প্রকৃতি থেকে অন্যান্য দেশিয় পাখিও হারিয়ে যাচ্ছে কালের গহবরে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।”
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদ আলী বলেন, “তালগাছ হলো বাবুই পাখিদের আশ্রয়স্থল। তালগাছেই সাধারণত তারা বাসা বাধে, সংসার পাতে। দেশে আগের মতো আর তালগাছ দেখা যায় না, দেখা যায় না বাবুই পাখিও। তবে বর্তমান সময়ে তালগাছের সঙ্কটে বাবুই পাখিরা বাসা তৈরির জন্য বেছে নিয়েছে নারিকেল গাছ। বাবুই পাখিদের টিকিয়ে রাখতে হলে বেশি করে তালগাছ রোপন করতে হবে, এর কোনও বিকল্প নেই। নতুবা দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমাদের দেশের প্রকৃতি থেকে বাবুই পাখি একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।”
বন কর্মকর্তা ও গবেষকরা জানান, আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলে বাবুই পাখি বাউই পাখি নামে অধিক পরিচিত। এদেশে তিন ধরণের বাবুই পাখি দেখা যায়। এগুলো হলো দেশি বাবুই, দাগি বাবুই ও বাংলা বাবুই। বাবুই পাখি দেখতে যেমন আকর্ষনীয় তেমনি তাদের তৈরিকৃত বাসার আকার-আকৃতিও বেশ দৃষ্টিননন্দন। তারা খড়, গাছের কচিপাতা, লতাপাতা ইত্যাদি দিয়ে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে বাসা তৈরি করে। শৈল্পিক বাসা তৈরি করে বলে বাবুই পাখিকে প্রকৃতির ইঞ্জিনিয়ারও বলা হয়।
অত্যন্ত পরিশ্রমি পাখি বাবুই দলবদ্ধ আর কলোনী করে জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত। বাবুই পাখিদের তৈরিকৃত বাসাগুলো দেখতে অনেকটা উল্টানো কলসির মতো। তাদের শিল্পচিন্তা অত্যন্ত নিপুণ। এরা সাধারণত বিভিন্ন ধরনের বীজ, ধান, কচিপাতা, পোকা ও ফুলের মধু খেয়ে জীবন ধারণ করে। মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। স্ত্রী বাবুই পাখি দুই থেকে চারটি ডিম পাড়ে। প্রায় দুই সপ্তাহে সেই ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। এক মাসের মধ্যেই বাবুই পাখির ছানা একা একা উড়তে পারে।