কয়রা (খুলনা) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬ ১০:৫৭ এএম
কমিটি না থাকায় বঞ্চিত হচ্ছেন খুলনা রেঞ্জের বনজীবীরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সুন্দরবন সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার ২০১৭ সালে ‘রক্ষিত এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা’ প্রণয়ন করলেও খুলনা রেঞ্জে সহ–ব্যবস্থাপনা কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর হয়ে রয়েছে।
বিধিমালা অনুযায়ী গ্রাম সংরক্ষণ ফোরাম, পিপলস ফোরাম ও কমিউনিটি পেট্রোলিং গ্রুপ (সিপিজি) প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রতিটি রেঞ্জে সহ–ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটি গঠনের কথা
বন ব্যবস্থাপনা, সিপিজি নিয়োগ, পর্যটন আয় বণ্টন এবং বননির্ভর মানুষের বিকল্প জীবিকা নির্ধারণের দায়িত্ব এই কমিটির ওপর ন্যস্ত।
তবে বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা রেঞ্জে সর্বশেষ নির্বাহী কমিটি গঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর নতুন বিধিমালা কার্যকর হলেও আর কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি।
খুলনা রেঞ্জের আয় যাচ্ছে সাতক্ষীরা রেঞ্জে
ফলে খুলনা রেঞ্জের আয় দীর্ঘদিন ধরে পাশের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সক্রিয় সহ–ব্যবস্থাপনা কমিটির তহবিলে জমা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, খুলনা রেঞ্জে কমিটি হালনাগাদ না থাকায় দুই রেঞ্জের আয়ই সাতক্ষীরা কমিটির তহবিলে জমা হচ্ছে।
এতে উন্নয়ন কার্যক্রমের বড় অংশ সাতক্ষীরায় বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং সভাগুলোও সেখানেই হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, গত দুই অর্থবছরে খুলনা ও সাতক্ষীরা মিলিয়ে প্রতি বছর প্রায় ২৯ লাখ টাকা করে তহবিলে জমা হয়েছে, যা সাতক্ষীরা রেঞ্জের মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে।
সর্বশেষ কমিটিতে ছিল রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রাধান্য
বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালে গঠিত সর্বশেষ কমিটিতে বননির্ভর মানুষের বদলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রাধান্য ছিল।
সভাপতি ছিলেন কয়রা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিজয় কুমার সরদার, সহসভাপতি অসিত কুমার মণ্ডল এবং রিয়াছাদ আলী কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও নথিতে উল্লেখ করা আছে।
নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৭ সালে নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে বনজীবী না হওয়ায় তারা যোগ্যতা হারান।
তবে গেজেট অনুযায়ী, নতুন কমিটি গঠন না হওয়া পর্যন্ত পুরোনো কমিটি আর্থিক সিদ্ধান্ত ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রম চালাতে পারবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই কমিটির কয়েকজন সদস্য সহ–ব্যবস্থাপনার প্রভাব ব্যবহার করে নানা অনিয়মে জড়ান।
নিষিদ্ধ এলাকায় জেলেদের পাঠানো, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং অবৈধভাবে পারশের পোনা আহরণের মতো কর্মকাণ্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
কমিটি গঠনে অনিয়মের অভিযোগ
দীর্ঘ আট বছর পর ২০২৪ সালে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে আবারও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
ভোটার তালিকায় বননির্ভর নন এমন বিতর্কিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তির অভিযোগে গত বছরের ৬ মে কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নির্বাচন স্থগিত করেন।
নির্দেশনায় বলা হয়, প্রকৃত বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে নির্বাচন করা যাবে না। একই সঙ্গে বন বিভাগকে দুই মাসের মধ্যে বননির্ভর মানুষের তালিকা চূড়ান্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের তৎকালীন কর্মকর্তা নির্মল কুমার মণ্ডল জানান, ইউএনওর নির্দেশনার পর গ্রাম সংরক্ষণ ফোরাম, পিপলস ফোরাম ও সিপিজির তালিকা পুনর্গঠন করা হয় এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হয়।
তবে পরবর্তীতে দেশের পরিস্থিতির কারণে নির্বাহী কমিটি গঠনের কাজ আর এগোয়নি, বলেন তিনি।
‘সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে বন বিভাগের নির্দেশে কার্যক্রম পরিচালনা’
যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির ‘ইকোসিস্টেম প্রতিবেশ’ প্রকল্পে কাজ করা মো. আলাউদ্দিন বলেন, বন বিভাগের আন্তরিকতার অভাবেই খুলনা রেঞ্জে নতুন কমিটি গঠন সম্ভব হয়নি।
তার ভাষায়, বন বিভাগ ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস রয়েছে, যার মূল কারণ ঘুষ ও অনিয়ম। নতুন কমিটি হলে জবাবদিহি বাড়বে—এ কারণেই এটি সক্রিয় করতে অনীহা দেখা যায়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, পুরোনো কমিটির অনেক সদস্য সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে বন বিভাগের নির্দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এমনকি সিপিজিতে অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদেরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তার মতে, সাতক্ষীরা রেঞ্জে নিয়মিত কমিটি থাকায় সেখানে সুবিধা পৌঁছালেও খুলনা রেঞ্জে প্রকৃত বনজীবীরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, খুলনা রেঞ্জের সহ–ব্যবস্থাপনা নির্বাহী কমিটি গঠনে বন বিভাগ আন্তরিক। বিতর্কিত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন কমিটি গঠনে কিছুটা সময় লাগবে।