মে দিবস
সাদিকুর রহমান, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ : ০১ মে ২০২৬ ০৯:৪৪ এএম
আপডেট : ০১ মে ২০২৬ ০৯:৪৫ এএম
কমলগঞ্জের চা বাগানে চা পাতা সংগ্রহ করছেন দুই নারী শ্রমিক। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ চা বাগানগুলো প্রকৃতিপ্রেমী ও পর্যটকদের কাছে এক অপার সৌন্দর্যের প্রতীক। সবুজে ঘেরা টিলা আর দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক পরিবেশ যেন এক স্বর্গরাজ্যের অনুভূতি দেয়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের অন্তরালে যারা দিনরাত শ্রম দিয়ে এই চিত্র নির্মাণ করেন, সেই চা শ্রমিকদের জীবনচিত্র আজও বঞ্চনা আর অবহেলায় আবৃত।
আজ পহেলা মে, বিশ্ব শ্রমিক দিবস। বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে পালিত হলেও কমলগঞ্জের চা শ্রমিকদের কাছে এটি আর দশটি দিনের মতোই একটি কঠোর পরিশ্রমের দিন। তাদের জীবনে এখনও কাটেনি দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও বৈষম্য।
চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে যে মজুরি তারা পান, তা বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে তারা প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধে হিমশিম খাচ্ছেন।
শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আবাসন সুবিধার ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে রয়েছেন। অধিকাংশ শ্রমিককে জরাজীর্ণ ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে হয়। উন্নত চিকিৎসার অভাব এবং উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগ তাদের জীবনকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রেখেছে।
প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত রোদে পুড়ে চা পাতা সংগ্রহই তাদের প্রধান কাজ। বৃষ্টির দিনে কর্দমাক্ত টিলায় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও দিনশেষে তাদের প্রাপ্য সম্মান বা সুযোগ-সুবিধা মেলে না।
পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিক লাবনী গড় ও হীরা গোয়ালা বলেন, তাদের জীবন যেন চা গাছের মতো। অন্যদের সতেজ রাখলেও নিজেদের জীবন থেকে যায় তিক্ততায় ভরা।
অন্যদিকে, আলীনগর চা বাগানের নারী শ্রমিকরা জানান, তারা শুধু পর্যটকদের ক্যামেরাবন্দী ‘সুখী শ্রমিক’ হয়ে থাকতে চান না; বরং ন্যায্য মজুরি, উন্নত চিকিৎসা, শিক্ষা এবং বাসস্থানের অধিকার চান।
শ্রমিক নেতাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধি, ভূমির মালিকানা, আবাসন এবং স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান এখনো মানবেতর পর্যায়ে রয়ে গেছে।
পাত্রখোলা চা বাগানের শ্রমিকনেতা মহাদেব মাদ্রাজি জানান, চা শ্রমিকদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে এদেশে এনে স্বল্প মজুরীর মাধ্যমে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের কাজ করানো হচ্ছে। এখনও চা শ্রমিকরা অধিকার বঞ্চিত আছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা রামভজন কৈরী বলেন, “চা শ্রমিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে দীর্ঘদিন ধরে মজুরি বৃদ্ধি, ভূমি অধিকার, বাসস্থান ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু এসব বাস্তবায়ন না হওয়ায় তাদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।
“অবহেলিত চা শ্রমিকদের বাসস্থানের জায়গাটুকু তাদের নিজের নামে দিতে হবে। যদি সেটা করা হয়, তাহলে আমরা দাসত্ব জীবন থেকে মুক্তি পাব।”