খুলনা অফিস
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০১ পিএম
খুলনা মহানগরীর সোনাগাঙ্গা বাস টার্মিনালের ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য ইজিবাইক। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নিয়ম আছে, সিদ্ধান্ত আছে, বৈঠকও হয়েছে তবু খুলনা মহানগরের সড়কে শৃঙ্খলা নেই। অনুমোদিত সংখ্যার বহুগুণ বেশি ইজিবাইক প্রতিদিন শহরের রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানজট, দুর্ঘটনা ও নাগরিক ভোগান্তি। প্রশাসনের একের পর এক উদ্যোগ, লাইসেন্স প্রদান, এমনকি অভিযান শুরুর পরও বাস্তবতায় দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই বরং পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে।
গত এক দশকে খুলনার পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে। একসময় যেখানে রিকশা ও বেবি ট্যাক্সির আধিপত্য ছিল, এখন সেখানে দখল নিয়েছে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক। পরিবেশবান্ধব ও কম খরচের কারণে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেলেও, নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তারে এই বাহনই এখন নগরীর জন্য বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) তথ্যমতে, নগরীতে প্রায় ১০ হাজার ইজিবাইকের লাইসেন্স আছে। কিন্তু বাস্তবে সড়কে চলাচল করছে ২০ থেকে ৩০ হাজার, কোনো কোনো হিসাবে ৫০ হাজারের কাছাকাছি ইজিবাইক। এর বড় একটি অংশই লাইসেন্সবিহীন বা ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২০ সালে যানজট নিরসনে প্রায় ৮ হাজার ইজিবাইকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। এর মধ্যে ৭৯৮টি যাত্রীবাহী ও ২০৯৬টি পণ্যবাহী ইজিবাইক ছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, নকল স্টিকার ও ফটোকপি লাইসেন্স ব্যবহার করে অবাধে চলছে হাজারো অবৈধ ইজিবাইক।
গল্লামারী, ডাকবাংলো, শিববাড়ী, জিরো পয়েন্টসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ মোড়েই একই চিত্র, রাস্তার বড় অংশজুড়ে ইজিবাইকের সারি। নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড না থাকায় চালকরাই সড়ক দখল করে যাত্রী ওঠানামা করছেন। ডাকবাংলো এলাকার ব্যবসায়ী ইসরাফিল বলেন, রাস্তার অর্ধেক জায়গা ইজিবাইক দখল করে রাখে। এতে শুধু যানজটই না, ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গল্লামারীর বাসিন্দা ইদ্রিস হাওলাদার জানান, প্রবেশপথে প্রতিদিন তীব্র যানজট হয়। কেউ ট্রাফিক সিগন্যাল মানে না। ব্রিজের ওপর কয়েকটি গাড়ি উঠলেই পুরো এলাকা থমকে যায়।
ডাকবাংলো এলাকায় ইজিবাইকের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও বাস্তবে প্রতিদিনই শতাধিক ইজিবাইক সেখানে ঢুকে পড়ে। অনেক চালক ফটোকপি লাইসেন্স বা অন্যের কাগজ ব্যবহার করছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। প্রাইভেট কার চালক হাসিব বলেন, ইজিবাইক হঠাৎ ব্রেক করে, যত্রতত্র যাত্রী নামায়। এতে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু কেউ তাদের লাইসেন্স যাচাই করে না। ৪৫ বর্গকিলোমিটারের খুলনা মহানগরে কার্যকর কোনো গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে ইজিবাইকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, যেখানে গণপরিবহন নেই, সেখানে বিকল্প বাহনই নিয়ন্ত্রণ নেবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি পরিকল্পনাহীনভাবে বাড়লে শহরের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একই সড়কে ধীরগতির ইজিবাইক ও দ্রুতগতির মোটরযান চলাচল করায় ট্রাফিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ইজিবাইকের কম গতি পেছনে যানজট তৈরি করে, যা দ্রুত বিস্তৃত হয়। কুয়েটের এক শিক্ষক বলেন, একই লেনে ১৫-২০ কিমি গতির ইজিবাইক আর ৫০-৬০ কিমি গতির গাড়ি চললে সংঘর্ষ ও জট বাড়বেই। আলাদা লেন ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।
নগরীর বিভিন্ন সড়কে চলমান উন্নয়ন কাজও যানজট বাড়াচ্ছে। সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন সড়কের বড় গর্ত, রূপসা শিপইয়ার্ড সড়কের ধীরগতির কাজ এবং গল্লামারী সেতুর নির্মাণ সব মিলিয়ে যানবাহনের চাপ নির্দিষ্ট এলাকায় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, সড়ক সংস্কার প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে সময় লাগবে। সমন্বয়ের অভাবে কিছু কাজ বিলম্বিত হচ্ছে। সম্প্রতি কেসিসি ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ যৌথভাবে অবৈধ ইজিবাইকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেও তা অনেকটাই থমকে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে গল্লামারী মোড়ে ট্রাফিক বিভাগ, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
গত ১০ মার্চ কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সভাপতিত্বে এক বৈঠকে যানজট নিরসনে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে বাস ও ট্রাক নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডে রাখা, সড়কে নির্মাণসামগ্রী না রাখা, দোকানের সামনে পণ্য না রাখা, যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ করা এবং ইজিবাইক ও রিকশার জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড নির্মাণ।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, জনগণকে একটি সুন্দর শহর দিতে হলে যানজট নিরসন জরুরি। প্রয়োজনে কিছু ক্ষতি হলেও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিয়ন্ত্রণহীন ইজিবাইক চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, হঠাৎ ব্রেক ও বেপরোয়া ওভারটেকিং পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। একজন ভুক্তভোগী বলেন, আমার গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে উল্টো আমাকে দোষ দিয়েছে। এদের কোনো জবাবদিহিতা নেই।
কেডিএ, কেসিসি ও এলজিইডির মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে অনেক সড়ক দীর্ঘদিন সংস্কারহীন পড়ে আছে। এতে সমস্যা আরও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া কোনো উদ্যোগই টেকসই হবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজন কার্যকর গণপরিবহন চালু, ইজিবাইকের সংখ্যা ও রুট নির্ধারণ, আলাদা লেন ও নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড কঠোর আইন প্রয়োগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং।
খুলনার ইজিবাইক সংকট এখন শুধু যানজটের সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। নগরবাসীর প্রত্যাশা শুধু অভিযান নয়, টেকসই সমাধান। অন্যথায় শান্তির শহর খুলনা ধীরে ধীরে পরিণত হবে এক অচল নগরীতে।