মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৯ এএম
আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩৩ পিএম
খুলনার খালিশপুরের চরের হাটে আজগার আহমেদের চায়ের দোকান। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
খুলনার খালিশপুরের চরের হাটে হঠাৎ চোখে পড়বে এক অদ্ভুত স্থাপনাÑ বিশাল একটি চায়ের কেটলি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো শিল্পকর্ম, কাছে গেলে বোঝা যায় সেটিই একটি জমজমাট চায়ের দোকান। কেটলির ভেতরে আলো ঝলমলে পরিবেশ, চুলায় ফুটছে চা, আর চারপাশে মসলার সুগন্ধÑ সব মিলিয়ে এটি এখন স্থানীয়দের কাছে এক ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতার জায়গা।
এই কেটলিওয়ালা শুধু নকশার জন্যই নয়, তার চায়ের স্বাদের জন্যও আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। এখানে পাওয়া যায় চাবানো চা, যে চা শুধু পান করাই নয়Ñ চিবিয়েও খেতে হয়। চায়ের মধ্যে থাকা লবঙ্গসহ বিভিন্ন সুগন্ধি মসলা চিবিয়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতাই এই চায়ের বিশেষত্ব। এক কাপ চা যেন শুধু পানীয় নয়, বরং স্বাদ ও অনুভূতির মিশেল।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন আজগার আহমেদ। একসময় তিনি ছিলেন একজন চিত্রশিল্পী। বিয়েবাড়িতে আল্পনা আঁকা, থ্রিডি আর্ট করাÑ এসবই ছিল তার কাজ। তবে জীবনের নানা চড়াই-উতরাই তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ছোট একটি টি-স্টল দিয়ে শুরু করলেও তার মাথায় ঘুরতে থাকে ভিন্ন কিছু করার চিন্তা। সেখান থেকেই জন্ম নেয় কেটলির আদলে দোকান তৈরির ধারণা।
আজগার বলেন, ‘আমি সব সময় চাইতাম এমন কিছু করতে, যা মানুষকে অবাক করবে। তাই কেটলির মতো দোকান বানানোর সিদ্ধান্ত নিই।’ প্রায় ৮০ হাজার টাকা খরচ করে তৈরি করেন এই বিশাল কেটলি। পারটেক্স ও স্টিল দিয়ে তৈরি কাঠামোর ভেতরেই গড়ে ওঠে তার চায়ের রাজ্য। তার দোকানে রয়েছে ১০ থেকে ১২ ধরনের চা। এর মধ্যে চাবানো চা সবচেয়ে জনপ্রিয়। এ ছাড়া দুধ চা, ব্লু টি, রোজেলা টি, কাশ্মীরি চা ও মালাই চা পাওয়া যায় এখানে।
এই উদ্যোগের পেছনে লুকিয়ে আছে এক আবেগঘন গল্পও। কানের অপারেশনের ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে আজগার শুরু করেন ব্যবসা। এখন প্রতিদিন ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকার চা বিক্রি করেন তিনি।
কেটলির ভেতরে বসে চা পান করতে আসা দর্শনার্থীরা শুধু স্বাদের জন্য নয়, উপভোগের জন্যও এখানে ভিড় করেন। নদীর ধারে খোলা আকাশের নিচে আড্ডা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোÑ সব মিলিয়ে জায়গাটি হয়ে উঠেছে তরুণদের প্রিয় আড্ডাস্থল।
একজন ক্রেতা জানান, এখানে চা খাওয়ার অভিজ্ঞতাই আলাদা। চায়ের স্বাদ যেমন ভালো, তেমনি পরিবেশটাও দারুণ। কেটলিওয়ালা এখন শুধু একটি চায়ের দোকান নয়; এটি সৃজনশীলতার প্রতীক। সীমিত সামর্থ্য নিয়েও ভিন্ন কিছু করার সাহস আর প্রচেষ্টার এক জীবন্ত উদাহরণ আজগার আহমেদের এই উদ্যোগ। তার গল্প প্রমাণ করে, ইচ্ছা থাকলে ছোট উদ্যোগও হয়ে উঠতে পারে বড় অনুপ্রেরণা।
খালিশপুরের এই কেটলিÑ শুধু চা পরিবেশন করে না, বরং পরিবেশন করে স্বপ্ন, সাহস আর ভিন্নভাবে বাঁচার এক গল্প।