মোস্তাফিজুর রহমান, কয়রা (খুলনা)
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১০ পিএম
আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১০ পিএম
উপকূলের শিশুরা বইয়ের বদলে হাতে নিচ্ছে জাল ও কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম। l দুেই শিশুকে বুধবার সকালে নদীর পাড়ে জাল মেরামত করতে দেখা যায়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কপোতাক্ষ ও শাকবাড়ীয়া নদীর জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করেই কাটে খুলনার কয়রা উপজেলার উপকূলীয় শিশুদের জীবন। যেখানে শৈশবে বইখাতা হাতে থাকার কথা, সেখানে অনেক শিশুর হাতে এখন জাল, দড়ি আর কাঁকড়া ধরার সরঞ্জাম।
দারিদ্র্য, অভাব ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে উপকূলের হাজারো শিশু আজ শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুন্দরবনঘেঁষা এই অঞ্চলে বহু পরিবারের দৈনন্দিন সংগ্রাম এতটাই কঠিন যে, শিশুদের পড়াশোনা ও খেলাধুলা প্রায় বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
`খাবারই জোটে না, স্কুলে যাবো কীভাবে’
গোবরা গ্রামের দুই ভাই যুবায়ের হোসেন ও সুমন হোসেনের জীবন সেই কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচিত্র। বাবা অন্যত্র সংসার করায় অসুস্থ মায়ের সঙ্গে তাদের জীবন কষ্টে কাটছে। বর্তমানে তারা পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী হলেও সংসার চালাতে নদী থেকে কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছে। প্রতিদিন শতাধিক কাঁকড়া সংগ্রহ করে অল্প দামে বিক্রি করেই চলে তাদের সংসার ও মায়ের চিকিৎসা।
একই এলাকার হাসান ও হোসেন নামের দুই ভাইয়ের গল্পও প্রায় একই। বাবার মৃত্যুর পর অসুস্থ মায়ের ভরসায় বড় হওয়া এই দুই ভাই পড়াশোনা ছেড়ে সংসারের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হয়েছে। তাদের ভাষায়, “ঠিকমতো তিনবেলা খাবারই জোটে না, স্কুলে যাবো কীভাবে?”
‘দারিদ্র্যের কারণে ভেঙে যাচ্ছে শিশুদের স্বপ্ন’
স্থানীয় মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, দারিদ্র্যের কারণে উপকূলের অনেক শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছে—মাছ ধরা, রেণুপোনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে ইটভাটার শ্রম পর্যন্ত। এতে শিশু অধিকার বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো, কয়রা উপজেলা শাখার সভাপতি তরিকুল ইসলাম বলেন, দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের অভাবে শিশুরা শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে। টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা ও কার্যকর নীতিমালা ছাড়া এই পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে। জরুরি ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ ছাড়া এই প্রজন্ম আরও পিছিয়ে পড়বে।
কয়রা উপজেলা ইমাম পরিষদের সভাপতি মাওলানা মিজানুর রহমান বলেন, অভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। তাদের শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
সব মিলিয়ে, উপকূলের শিশুদের শৈশব আজ বইখাতা নয়; বরং কঠিন জীবনসংগ্রামের ভারে তাদের শিক্ষার স্বপ্ন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।