তারাচরণ টিপু, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:০৬ এএম
মুষলধারার কিছু সময়ের বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম মহানগর। মঙ্গলবার নগরীর প্রবর্তক মোড় থেকে তোলা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
চট্টগ্রাম নগরী বর্ষা এলেই যেন এক পুরনো, পরিচিত সংকটে পড়ে জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলি এমনকি গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোও পানিতে তলিয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম।
মঙ্গলবার সকাল থেকেই নগরীর প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পানিতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। সরেজমিন দেখা গেছে, অনেক সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়েছে, সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ যানজট। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা পড়েন সীমাহীন দুর্ভোগে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সিডিএ কয়েকটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে খাল পুনঃখনন, ড্রেন সম্প্রসারণ এবং আধুনিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তবে বাস্তবে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কাতালগঞ্জের বাসিন্দা শওকত বলেন, বছরের পর বছর একই সমস্যা থাকলেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান মিলছে না। অনেক ক্ষেত্রে সড়ক উন্নয়ন বা খোঁড়াখুঁড়ি কাজের কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত ও পরিকল্পনাগত সমস্যা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল ও ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবÑ এসবই নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তুলেছে। নগরীর অনেক খাল দখল হয়ে গেছে, আবার অনেক জায়গায় ময়লা-আবর্জনায় ভরে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইদ্রিস আলী বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি এক সপ্তাহ বা এক মাসের কাজ নয়। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে আমরা একই কথা শুনে আসছিÑ কাজ চলমান। বাস্তবে এর দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত।
তিনি আরও বলেন, মাত্র ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই শহর তলিয়ে যায়। খালগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। শত শত কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে গতি নেই। অধ্যাপক ইদ্রিস আলী অতীতের এক মর্মান্তিক ঘটনার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, অসম্পূর্ণ নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে ২০২৩ সালে নালায় পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে।
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। মঙ্গলবার সকালে তিনি মুরাদপুর, কাতালগঞ্জ ও প্রবর্তক মোড়সহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
পরিদর্শন শেষে মেয়র জানান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন খাল সংস্কার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। বিশেষ করে হিজরা খাল ও জামালখান খালের সংস্কারকাজ চলার কারণে কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, চলমান উন্নয়নকাজের কারণে সাময়িক দুর্ভোগ তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মেয়র আরও জানান, আগামী ১৫ মের মধ্যে সিডিএর খাল সংস্কারকাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কাজ শেষ হলে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে এবং জলাবদ্ধতা অনেকটাই কমে আসবে।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, চলমান বর্ষা মৌসুমেই নগরীর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে নগরবাসীর প্রশ্নÑ এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কবে? প্রতি বছর একই আশ্বাস আর দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি কি শেষ হবে?