নারায়ণগঞ্জ অফিস
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩২ পিএম
আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৩৭ পিএম
নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের ঘটনার এক যুগ পরও বিচারের রায় কার্যকরের আশায় স্বজনরা। ছবি: সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুনের ঘটনার এক যুগ পূর্ণ হলো আজ সোমবার। দীর্ঘ সময়েও এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় কার্যকর না হওয়ায় ক্ষোভ, হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে স্বজনদের। মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন তারা। নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালত প্রাঙ্গনে সোমবার বেলা ১১টার দিকে এ কর্মসূচি পালিত হয়।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে নিহতদের পরিবারের স্বজনরা ও স্থানীয় বাসিন্দারা বর্তমান সরকারের নিকট হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন।
মানববন্ধনে অংশ নিয়ে খুন হওয়া নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, “২০১৪ সালে যে নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, তা দেশবাসী সবাই জানেন এবং দেখেছেন। নূর হোসেন নামের এক মাফিয়া কিভাবে টাকার প্রভাবে র্যাব সদস্যদের ব্যবহার করে অমানবিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করে মরদেহ শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দিয়েছিল- সেই দৃশ্য দেখে সারাদেশের মানুষ কেঁদেছিল। পুরো জাতি তখন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।”
তিনি বলেন, “আজ হয়তো ভয়-ভীতি, মামলা ও আতঙ্কের কারণে অনেকেই সামনে আসতে সাহস পান না। কিন্তু আমরা তো আমাদের আপনজন হারিয়েছি। আমরা পরিবারগুলো ১২ বছর ধরে বুকভরা কান্না আর অসহনীয় কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছি। আমাদের একটাই দাবি- নজরুলসহ সাত পরিবারের এই নির্মম হত্যার বিচার যেন আমরা জীবিত অবস্থায় দেখে যেতে পারি।”
ওসমান পরিবার জড়িত: এমপি আল আমিন
ত্বকী হত্যা থেকে শুরু করে সাত খুন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের আলোচিত অনেক ঘটনার সঙ্গে ওসমান পরিবারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে আলোচিত সাত খুন মামলার ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে সোমবার মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি এ দাবি করেন।
সাত খুন মামলার ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে সোমবার মানববন্ধনে বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন।
বক্তব্যে তিনি অতীতের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, “বিগত সময়ে দেশে এক ধরনের অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমরা সেই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে চাই।”
সাত খুনের ঘটনায় নিহত আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “চন্দন কুমার সরকার নিজের বিবেকের তাড়নায়, পেশাগত দায়িত্ব থেকে অপরাধের প্রমাণ রাখতে চেয়েছিলেন। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, এই সততা ও সাহসিকতার কারণেই তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।”
আইনজীবীদের ভূমিকাও তুলে ধরে তিনি বলেন, “অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে আইনজীবীরা তৎকালীন রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভিকটিমদের পরিবারকে আইনি সহায়তা দিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীরা যেভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”
তিনি আরও বলেন, “বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অতীতের মতো ভবিষ্যতেও ন্যায়বিচারের দাবিতে আইনজীবীদের পাশে থাকব।”
মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির আশা আইনজীবীর
আলোচিত সাত খুনের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মামলার আইনজীবী ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।
তিনি বলেছেন, “আওয়ামী লীগের আমলে এটর্নি জেনারেলদের সঙ্গে আমরা নিহতের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বারবার যোগাযোগ করেছি। কিন্তু তাদের মন গলেনি। মামলাটি শুনানির লিস্টে তারা অন্তর্ভুক্ত করেনি। আমরা আইনমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য যে লিভ টু আপিল করা হয়েছে সেটা দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে। এটর্নি জেনারেল আশ্বাস দিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে এটা লিস্টে এনে এর বিচার নিষ্পত্তি করা হবে।”
নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালত প্রাঙ্গনে সোমবার সাত খুনের এক যুগ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নিয়ে একথা বলেন তিনি।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “সাত খুনের পরে ডিসি এসপিসহ সকল অফিসারদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জে গডফাদারদের রাজত্বে তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকার জন্য তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। পরবর্তী এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন হয়।”
সাত খুন মামলার ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে সোমবার মানববন্ধনে বক্তব্য দেন মামলার আইনজীবী এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।
তিনি বলেন, “তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ এনায়েত হোসেন সপ্তাহে দুই তিন দিন করে শর্ট ডেট দিয়ে এই মামলায় ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। আদালত অতি অল্প সময়ে ২৬ জনের মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন ও বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। বাকিদের সাজা বহাল রাখা হয়েছিল, তারা সাজা খেটে জেল থেকে বেরিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই বিচারের পরে বাংলাদেশে গুম খুন অনেকটা কমে গিয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের রায় হলে যারা খুন গুম করে তাদের জন্য এটা শিক্ষনীয় বিষয় হিসেবে পরিগণিত হবে।”
মানববন্ধনে জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের আইনজীবী, রাজনৈতিক কর্মী ও সচেতন নাগরিকরা অংশ নেন।
২০১৪ সালের এই দিনে আদালত থেকে জামিন নিয়ে প্রাইভেট কারে ঢাকায় ফিরছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তার চার সহযোগী। বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় সাদাপোশাকে র্যাবের একটি দল তল্লাশিচৌকি বসিয়ে নজরুলসহ পাঁচজনকে তুলে নিয়ে যায়। একই সড়ক থেকে প্রায় একই সময়ে নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমও নিখোঁজ হন।
তিন দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জনের ও পরদিন ১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কাউন্সিলর, আইনজীবীসহ সাতজনের হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।