বাঙ্গরা বাজার
নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৩১ এএম
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার জিনোদপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গরা বাজার। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার জিনোদপুর ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গরা বাজার এখন দখল–উচ্ছেদের অন্তহীন চক্রে বন্দি। শত বছরের পুরোনো এই বাজারটি প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০টি গ্রামের মানুষের সমাগমে মুখর থাকে এবং স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও জনপদ (সওজ) বিভাগের সরকারি জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা প্রায় ৬০০ দোকানকে ঘিরে অদৃশ্য কোটি টাকার লেনদেন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দুই দশক ধরে বাজারটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরাম করিম গোষ্ঠী ও নাজিম সরকার গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। নাজিম সরকার গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্তমান চেয়ারম্যান রবিউল আউয়াল রবি ও তার ভাই যুবলীগ নেতা শফিকুল ইসলাম। অন্যদিকে বিরাম করিম গোষ্ঠীর হয়ে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব আবু কাউছার আহামেদ এবং তার ভাই ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি শামীম আহামেদ।
স্থানীয় সূত্রে বলছে, এই দ্বন্দ্ব এখন আর প্রভাব বিস্তারে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে সুসংগঠিত দখল বাণিজ্যে। একই পক্ষ কখনো দখলদার, আবার কখনো উচ্ছেদে বাধা প্রদানকারী হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই প্রশাসনের অভিযানে বাঙ্গরা বাজারে সওজের জায়গায় গড়ে ওঠা ৩৪৮টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তবে উচ্ছেদের পরপরই দোকান নির্মাণের নামে প্রায় ২ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠে চেয়ারম্যান রবিউল আউয়াল রবির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেন এবং থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। পরে চাপের মুখে প্রায় ৬০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, উচ্ছেদের পর গোপনে দোকান বরাদ্দের তালিকা তৈরি করে প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় নতুন করে দোকান নির্মাণ ও অর্থ আদায় শুরু হয়। এ প্রক্রিয়ায় আবারও কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে আবু কাউছার আহামেদের নাম উঠলেও তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “আমি এই বিষয়ে অবগত নই, তবে আমার একটি দোকান এখানে লিজ নেওয়া আছে। আপনারা কাগজপত্র যাচাই করতে পারেন।”
স্থানীয় সূত্র বলছে, সরকারি জায়গায় গড়ে ওঠা প্রতিটি দোকান ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকায় হাতবদল হচ্ছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ মানুষ।
সম্প্রতি দোকান নির্মাণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। দেশীয় অস্ত্রের সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন এবং গুরুতর আহত হন যুবলীগ নেতা শফিকুল ইসলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষে পুরো বাজার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ ঘটনায় চেয়ারম্যান রবিউল আউয়াল রবি, তার ভাই রুবেল মিয়া ও আত্মীয় পলাশ মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পাল্টাপাল্টি দুটি মামলা হয়। এক পক্ষের গ্রেপ্তার হলেও অন্য পক্ষ এখনও অধরা রয়েছে।
নবীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চেয়ারম্যানসহ তিনজনকে উদ্ধার করে। পরে বাজার কমিটির সভাপতি শামীম আহামেদ এর দায়ের করা মামলায় তাদের আসামি করা হয়। অন্য পক্ষও মামলা করেছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।
এদিকে ২০২৫ সালে আবারও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের প্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক ও জনপদ বিভাগ দ্বিতীয়বার উচ্ছেদের জন্য নোটিশ জারি করলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জানান, “আগে উচ্ছেদ করার পর আবার অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। খুব দ্রুতই আবার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”