ইকোট্যুরিজম
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ঢাকা ও মোস্তাফিজুর রহমান কয়রা
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪০ এএম
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ১২:২৪ পিএম
খুলনার কয়লা উপজেলা সংলগ্ন সুন্দরবনের সৌন্দর্য পর্যটকদের জন্য হেয়ে উঠতে পারে বড় আকর্ষণ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
খুলনার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের এক অনন্য জনপদ কয়রা উপজেলা। খুলনা জেলার শেষ প্রান্তে অবস্থিত এটি। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সুন্দরবন ও বঙ্গোসাগরের বিভিন্ন শাখা নদী। কয়রার কোল ঘেঁষে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। এ যেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক অসাধারণ সমন্বয়।
এরপরও পর্যটন শিল্পে পিছিয়ে রয়েছে এই এলাকা। অনেক সম্ভাবনা থাকলেও কোনো সরকারই এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়নি। এখানে কোনো হোটেল-মোটেলও গড়ে ওঠেনি। ঢাকা থেকে সরাসরি যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে কয়রায়। খুলনা শহর থেকে অনেকেই এসব এলাকা ঘুরে রাতেই খুলনায় ফিরে আসেন। কয়রায় হোটেল-মোটেল গড়ে উঠলে পর্যটকদের বিপুল সাড়া মিলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়া সুন্দরবনের বড় একটি অংশ কয়রার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে পড়েছে। নদ-নদী, খাল-বিল, সবুজ বনভূমি এবং বন্যপ্রাণীর বিচরণÑ সব মিলিয়ে পর্যটনের জন্য এখানে এক আদর্শ পরিবেশ বিদ্যমান। কিন্তু পর্যাপ্ত অবকাঠামো, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অভাবে সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ ভান্ডার
স্থানীয়দের মতে, পর্যটন খাতকে সঠিকভাবে বিকশিত করা গেলে শুধু এই অঞ্চলের নয়, পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যেতে পারে। কয়রা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, ঐতিহাসিক নিদর্শনের জন্যও সমৃদ্ধ। সুলতানি আমলে আবিষ্কৃত মসজিদকুঁড় মসজিদ মুসলিম স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এই মসজিদকে ঘিরেই এলাকার নামকরণ হয়েছে ‘মসজিদকুঁড়’। বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম নেতা রাজা প্রতাপাদিত্যের স্মৃতিচিহ্ন, প্রাচীন দিঘি, খানজাহান আলীর (র.) অনুসারীদের মাজার এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা এই অঞ্চলকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। কয়রায় আসার পথে পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলি এলাকায় দেখা মেলে উপমহাদেশের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের স্মৃতিবিজড়িত স্থান। সব মিলিয়ে প্রকৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য সমাহার রয়েছে এই জনপদে, যা পর্যটনের জন্য এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
অবকাঠামোগত সমস্যা বড় চ্যালেঞ্জ
সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কয়রার পর্যটন খাত এখনও অনুন্নত। নেই উন্নতমানের হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ বা মানসম্মত রেস্টুরেন্ট। অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ দুর্বল, নৌপথে যাতায়াতও সবসময় সহজ নয়। পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আধুনিক সুবিধার অভাবও বড় বাধা। ফলে দেশের অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্র যেমন কক্সবাজার বা সেন্টমার্টিনের তুলনায় কয়রা এখনও পর্যটকদের কাছে অচেনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে পারলে খুব অল্প সময়েই কয়রা একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
কয়রা উপজেলা জলবায়ু ফোরামের সভাপতি রাসেল আহাম্মেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ম্যানগ্রোভ বনভিত্তিক ইকোট্যুরিজম উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত। এটি একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার মতে, পরিকল্পিত ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে স্থানীয় বনজীবীদের ঝুঁকিপূর্ণ পেশা থেকে সরিয়ে বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি হবে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোশাররফ হোসেন বলেন, “পরিকল্পিত ইকোট্যুরিজম চালু হলে শিক্ষিত তরুণদের জন্য গাইড, রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।”
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “কয়রা থেকে গহিন সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করা সহজ। তেঁতুলতলারচর, কাটকাটা, কাশিয়াবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় লোকালয় থেকেই হরিণসহ বন্যপ্রাণী দেখা যায়, যা পর্যটকদের জন্য বিরল অভিজ্ঞতা হতে পারে।”
বড় আকর্ষণ জীববৈচিত্র্য
কয়রা সংলগ্ন সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর জীববৈচিত্র্য। সুন্দরবনের অন্যান্য স্পটের চেয়ে এখানে বেশি দেখা মেলে বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, কুমির এবং নানা প্রজাতির পাখির। সুন্দরবনের অভয়ারণ্য যেমন হিরণ পয়েন্ট ও কটকার নৈকট্য এই অঞ্চলকে অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এখান থেকে সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে যাওয়া যায়। যে কেউ সুন্দরবনের পড়ন্ত বিকালের অপরূপ দৃশ্য দেখলে আকৃষ্ট হবেন। অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে। সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় হবে। প্রবাসী সাংবাদিক ফরহাদ হুসাইন বলেন, “কয়রা সুন্দরবনের একটি আদর্শ ‘গেটওয়ে’ হতে পারে। নৌপথে সহজ যোগাযোগ এবং অভয়ারণ্যের নৈকট্য পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দিতে পারে।”
কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা
পর্যটন খাত বিকশিত হলে কয়রার অর্থনীতিতে আসবে ব্যাপক পরিবর্তন। স্থানীয়ভাবে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা যেমন দোকান, হস্তশিল্প, খাবারের স্টল বৃদ্ধি পাবে।
স্থানীয় যুবকদের জন্য ট্যুর গাইড, নৌযান চালক, ড্রাইভার এবং হোটেল কর্মী হিসেবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও তৈরি হবে নতুন ক্ষেত্র, বিশেষ করে কটেজ ইন্ডাস্ট্রি, হস্তশিল্প ও খাবার ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ। স্থানীয় কৃষি ও মৎস্য পণ্যের চাহিদা বাড়বে। কৃষক ও জেলেদের আয় বৃদ্ধি পাবে। সরকার পাবে বাড়তি রাজস্ব, আর বিদেশি পর্যটকদের মাধ্যমে আসবে বৈদেশিক মুদ্রা।
পরিবেশ সংরক্ষণে পর্যটনের গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব। পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বনের ওপর মানুষের চাপ কমবে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা সহজ হবে।
স্থানীয় জনগণের মধ্যে পরিবেশ রক্ষার সচেতনতা বাড়বে। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষিত থাকবে।
সমন্বিত উদ্যোগই চিত্র বদলে দিতে পারে
জনপ্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা কয়রায় ইকোট্যুরিজম বিকাশে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন। যেমনÑ দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পর্যটন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সড়ক ও নৌযোগাযোগ উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে কয়রা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হবে। এতে উপকূলীয় জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত হবে।”
বদলে যাবে কয়রা
সব দিক বিবেচনায় স্পষ্ট, কয়রা শুধু একটি উপকূলীয় উপজেলা নয়, এটি সম্ভাবনার এক বিশাল ক্ষেত্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে এটি হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম সেরা ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র। এতে কয়রা হয়ে উঠতে পারে উপকূলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন মডেল। এর জন্য প্রয়োজন শুধু সঠিক পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ এবং বাস্তবায়নের দৃঢ়তা।