টেকনাফ (কক্সবাজার) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:১০ পিএম
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বুধবার সকাল থেকে নৌবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ ও মানব পাচার দমনে পাহাড়ি এলাকায় যৌথ অভিযান শুরু করেছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়ন একসময় ছিল বন ও পাহাড়নির্ভর শান্ত জনপদ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এলাকাটি পরিণত হয়েছে অপহরণ ও মানব পাচারের এক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র।
পাহাড়ি গোপন আস্তানায় মানুষকে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায় এবং সুযোগ পেলেই সাগরপথে মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি পাহাড়ি এলাকায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার এবং আন্দামান সাগরে মালয়েশিয়াগামী ট্রলারডুবিতে ৯ জন জীবিত উদ্ধার ও বহু নিখোঁজের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সীমান্তজুড়ে।
যৌথ অভিযান
এ পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বুধবার সকাল থেকে নৌবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ ও মানব পাচার দমনে পাহাড়ি এলাকায় যৌথ অভিযান শুরু করেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উখিয়া সার্কেল) রকিবুল হাসান জানান, বাহারছড়াসহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় অপরাধীদের আস্তানায় অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযান চালিয়ে বুধবার কয়েকটি অপহরণ ও মানব পাচারকারীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতন করতে কাজ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শীলখালী এলাকায় তিনজনের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা প্রক্রিয়াধীন এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
৯৫ ঘটনায় অপহৃত অন্তত ১৪০ জন
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৮৫ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গত এক বছরেই ৯৫ ঘটনায় অন্তত ১৪০ জন অপহৃত হন, যাদের ৮৬ জন রোহিঙ্গা।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসেন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে টেকনাফ সদর, হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়ন উল্লেখযোগ্য।
একই সঙ্গে মানব পাচারের ঘটনাও উদ্বেগজনক। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়াগামী অন্তত ৩ হাজার ১৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এ সময়ে ১১৫টি মামলায় প্রায় ১ হাজার ১০০ জনকে আসামি করা হয় এবং ৬০০ পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে।
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে নারী-শিশুসহ ২৬৩ জনকে উদ্ধার এবং ১০ পাচারকারীকে আটক করা হয়।
সন্ধ্যার পর নিরাপদ নয় কেউ
বাহারছড়া ও কচ্ছপিয়া এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে স্থানীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদক ও পণ্যের চোরাচালান, সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্র এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা এ অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়হীনতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল আজিজ বলেন, “প্রায় প্রতিদিনই অপহরণের ঘটনা ঘটছে। সন্ধ্যার পর কেউ নিরাপদ নয়। সন্তানদের বাইরে যেতে দিই না।”
মুদি দোকানি জালাল উদ্দিন বলেন, “কখন কাকে ধরে নিয়ে মুক্তিপণ চাইবে, বলা যায় না। টাকা না পেলে পাচার করে দেয়।”
সম্প্রতি অপহরণকারীদের হাত থেকে ফিরে আসা নুর আলম জানান, পাহাড়ের ভেতরে প্রায় দুই শতাধিক মানুষকে বন্দি অবস্থায় দেখেছেন। প্রতিদিন নির্যাতন চালিয়ে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হয়।
“আমার কাছ থেকেও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল,” দাবি করেন তিনি।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম নজরুল বলেন, অপহরণ ও মানব পাচার একই চক্রের অংশ। এদের দমন করতে শক্ত পদক্ষেপ জরুরি, না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
ইউপি সদস্য ফরিদ উল্লাহ জানান, সাতটি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। তিনি অতিরিক্ত নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন, পাচারকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং মাছ ধরার নৌযান নিবন্ধনের দাবি জানান।
পাশাপাশি মেরিন ড্রাইভ এলাকায় বিশেষ করে সন্ধ্যার পর পর্যটকদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।