শাহিনুর সুজন, (চারঘাট) রাজশাহী
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০৭ পিএম
আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ১২:১০ পিএম
কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাবলিক টয়লেটগুলো দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে থাকায় পুরো এলাকা এখন দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ।
কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাবলিক টয়লেটগুলো দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে থাকায় পুরো এলাকা এখন দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, জনস্বাস্থ্য এবং আশপাশের সামাজিক পরিবেশের ওপর।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবময় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি সারদা এবং চারঘাটের শিক্ষা অঙ্গনের গর্ব সরদহ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়Ñ এই দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সন্নিকটে গড়ে ওঠা টয়লেটগুলোকে ঘিরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
ঐতিহ্য ও পেশাগত উৎকর্ষের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি সারদা শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই সুপরিচিত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলোÑ এমন দুটি সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানের পাশেই বর্তমানে বিরাজ করছে চরম অব্যবস্থাপনা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীরসংলগ্ন পৌরসভার নির্মিত পাবলিক টয়লেটটি দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। টয়লেটের ঠিক পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে ময়লার ভাগাড়, যেখানে নিয়মিতভাবে বাজারের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। সেখান থেকে নির্গত তীব্র দুর্গন্ধ বাতাসের সঙ্গে পুরো স্কুল প্রাঙ্গণ এবং আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষ করে গরমের সময় এই দুর্গন্ধ অসহনীয় হয়ে ওঠে। অনেক সময় সামান্য বাতাসেই সেই দুর্গন্ধ শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, টয়লেট অচল থাকায় আশপাশের কিছু মানুষ খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে স্বীকৃত চারঘাটে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আটটি পাবলিক টয়লেটের অধিকাংশই বর্তমানে তালাবদ্ধ বা ব্যবহার অনুপযোগী। যেগুলো খোলা রয়েছে, সেগুলোরও অবস্থা নাজুকÑ পানির সংযোগ নেই, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব এবং তীব্র দুর্গন্ধে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সারদাহ বাজার, ট্রাফিক মোড়, কাঁকড়ামাড়ী বাজার ও ক্যাডেট কলেজ মোড় এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্মিত টয়লেটগুলো কার্যত অচল। কোথাও তালাবদ্ধ, কোথাও ময়লার ভাগাড়ের পাশে অবস্থান করায় সাধারণ মানুষ সেগুলো ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে আশপাশের খোলা স্থানই হয়ে উঠেছে বিকল্প শৌচাগার।
স্থানীয় ব্যবসায়ী উজ্জ্বল জোয়ার্দার বলেন, পৌরসভার চারটি টয়লেটই অকেজো। মানুষ বাধ্য হয়ে খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করছে। এতে এলাকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, ক্রেতাও কমে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরদহ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীরসংলগ্ন টয়লেটটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এবং পাশেই ময়লার ভাগাড় গড়ে ওঠায় তীব্র দুর্গন্ধে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করতে পারছে না।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাহে নাজাত বলেন, দুর্গন্ধে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে মনোযোগ ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
একই বিষয়ে শিক্ষার্থীর বাবা মাসুদ রানা বলেন, সন্তানকে এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পাঠানো নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
শিক্ষার্থীরাও জানায়, বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশে আগে তারা বিশ্রাম নিতো। কিন্তু এখন দুর্গন্ধের কারণে সেখানে যাওয়া যায় না, এমনকি সেই দুর্গন্ধ শ্রেণিকক্ষেও পৌঁছে যায়।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ইউজিআইআইপি-৩ প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছয়টি টয়লেট নির্মাণে প্রতিটিতে ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে আরও দুটি টয়লেট নির্মাণে প্রতিটিতে ২০ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়। কিন্তু নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই অধিকাংশ টয়লেট অচল হয়ে পড়ে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ও সুশীল সমাজের নেতারা বলছেন, পরিকল্পনার অভাব ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, পুরো পৌর এলাকা এখন উন্মুক্ত টয়লেটে পরিণত হয়েছে, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চারঘাট শাখার সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, প্রথম শ্রেণির পৌরসভার অন্যতম শর্তই হচ্ছে উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু এখানে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আতাউর রহমান বলেন, পৌরবাসীর প্রয়োজন বিবেচনায় টয়লেটগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। কিছুদিন আগে পরিষ্কার করা হয়েছিল। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক ও ভারপ্রাপ্ত ইউএনও রাহাতুল করিম মিজান জানান, আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে