খোকন বিকাশ ত্রিপুরা জ্যাক, খাগড়াছড়ি
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:৩৪ পিএম
আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:২১ পিএম
বিজু উৎসবে মেতেছেন চাকমা তরুণীরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ভোরের নরম কুয়াশা ভেদ করে পূর্ব দিগন্তে সূর্যের লাল আভা ছড়িয়ে পড়তেই খাগড়াছড়ির সবুজ পাহাড় যেন সেজেছে এক মায়াবী সাজে।
চেঙ্গী নদীর তীরে রবিবার ভোরে দেখা যায় এক অপার্থিব দৃশ্য—হাতে রঙিন বুনো ফুল নিয়ে মানুষের ঢল, মৃদুমন্দ প্রার্থনার ধ্বনি আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মিক মেলবন্ধন। এভাবেই বর্ণিল আয়োজনে খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’।
চাকমা সম্প্রদায়ের ‘ফুল বিজু’ এবং ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ‘হারি বৈসু’ পালনের মধ্য দিয়ে এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে। আনন্দ, আবেগ আর ঐতিহ্যের আবহে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে মেতে উঠেছে পুরো পাহাড়।
নদীতে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা
ভোর হতেই চেঙ্গী নদী, বিভিন্ন ছড়া ও ঝরনাঘাটে ভিড় জমায় সব বয়সী মানুষ। সবার হাতে জবা, গাঁদা, বকুল ও শিউলিসহ নানা রঙের বুনো ফুল। শাস্ত্রীয় রীতি অনুযায়ী, নদীর জলে ফুল ভাসিয়ে গঙ্গাদেবীর কাছে প্রার্থনা করা হয়। এই প্রাচীন প্রথার মাধ্যমে বিদায় জানানো হয় পুরনো বছরের দুঃখ-গ্লানি ও অশুভ শক্তিকে; বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরের সম্ভাবনা ও মঙ্গলকে।
উৎসবের অনুভূতি জানিয়ে রুনা চাকমা বলেন, “ফুল দিয়ে প্রণামের মাধ্যমে আমরা পুরোনো বছরের সব কষ্ট আর পাপকে বিদায় জানাই। নতুন বছর যেন সবার জন্য শান্তি আর সুখ বয়ে আনে—এই কামনাই করি”।
ঊর্নিষা চাকমা নামের আরেক তরুণী বলেন, “ফুল বিজু আমাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। নদীতে ফুল দিয়ে প্রণাম করার মধ্য দিয়েই আমরা নতুন বছরকে স্বাগত জানাই”।
তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে জীবন্ত ঐতিহ্য
ফুল বিজুকে ঘিরে পাহাড়ের তরুণ-তরুণীদের মাঝে ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাক—পিনন-হাদি ও রিনাই-রিসা পরে তারা উৎসবে যোগ দেন।
রাজশ্রী ও রেশমি চাকমার মতে, সারাবছর সবাই কর্মব্যস্ত থাকলেও বিজু এলে সব ভেদাভেদ ভুলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
তনি ও রুবিনা চাকমা বলেন, পর্যটকদের আগমনে উৎসবের পরিধি বাড়লেও মূল সংস্কৃতি যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, সেদিকে সবার নজর দেওয়া প্রয়োজন।
সার্বজনীন উৎসবে বৈসাবি
এক সময় পাহাড়ের মানুষের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও বৈসাবি এখন সার্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা এই উৎসব দেখতে ভিড় জমিয়েছেন।
চট্টগ্রাম থেকে আসা লাবনী বগুয়া ও ঢাকার সীমা দাশ মুগ্ধ হয়ে বলেন, “প্রকৃতি ও সংস্কৃতির এমন অপূর্ব মিলনমেলা সত্যিই বিরল। পাহাড়ের মানুষের সরলতা ও আতিথেয়তা আমাদের মুগ্ধ করেছে”।
আচার, বিশ্বাস ও জীবনদর্শন
ফুল বিজু মূলত পবিত্রতা ও নতুন শুরুর বার্তা দেয়। এদিন ঘরবাড়ি পরিষ্কার করে ফুল ও নিমপাতা দিয়ে সাজানো হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এদিন যে আগে ঘুম থেকে উঠে স্নান করতে পারে, সে পুরো বছর চনমনে থাকে। চৈত্র মাসের শেষ দিনে পালিত হবে ‘মূল বিজু’, যার প্রধান আকর্ষণ ২২ প্রকারের শাক-সবজি দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পাজন’। বিজুর শেষ দিন ‘গজ্জ্যেপজ্জ্যে’ বা নববর্ষের দিনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রার্থনা ও গুরুজনদের আশীর্বাদ নেওয়ার মাধ্যমে উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।