নিপুণ ছোঁয়ায় সাজছে মাটির সামগ্রী
মনিরুজ্জামান বাবলু, চাঁদপুর
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৩৪ পিএম
আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৩৬ পিএম
বৈশাখী মেলা সামনে রেখে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে নিজ গৃহে মাটির তৈরি পণ্যে তুলির আঁচড়ে রঙিন করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পী সেটু পাল ও অর্পিতা পাল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বছরজুড়ে মাটির তৈরি তৈজসপত্রের চাহিদা কম থাকলেও পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে সুদিন ফেরার অপেক্ষায় চাঁদপুরের মৃৎশিল্পীরা। বৈশাখী মেলা ও উৎসবের আমেজকে সামনে রেখে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাল পাড়াগুলোতে। নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় কাদা-মাটি দিয়ে তৈরি হচ্ছে পুতুল, হাতি, ঘোড়া ও হাঁড়ি-পাতিলসহ বাহারি সব খেলনা ও ঘর সাজানোর সামগ্রী।
সরেজমিনে ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া, শোল্লা ও মানুরী গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। পাইকপাড়া গ্রামের পালপাড়ার প্রতিটি ঘরে এখন উৎসবের আমেজ। বাড়ির আঙিনায় নারী-পুরুষ সবাই মিলে কাজ করছেন। কেউ চাক ঘুরিয়ে মাটি দিয়ে গড়ছেন তৈজসপত্র, কেউ রোদে শুকানো পণ্যগুলো আগুনে পোড়াচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত সময় পার করছেন পোড়া মাটির পণ্যে নিপুণ তুলির আঁচড়ে রঙ করার কাজে। বৈশাখী মেলায় বিক্রির জন্যই মূলত এই ব্যাপক প্রস্তুতি।

মৃৎশিল্পী নয়ন পাল, জবা পাল ও অর্পিতা পাল জানান, সারা বছর ব্যবসা মন্দা থাকলেও নববর্ষের মেলাগুলোতে মাটির জিনিসের ব্যাপক চাহিদা থাকে। এই সময়ের বাড়তি আয় দিয়েই তারা সারা বছরের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন।
তবে ঐতিহ্যের এই পেশা টিকিয়ে রাখা নিয়ে শঙ্কায় আছেন অনেকে। স্থানীয় মৃৎশিল্পী মিন্টু ও বিকাশ পাল বলেন, “পৈতৃক পেশা ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে আছি। কিন্তু পুঁজি সংকট আর প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে এই শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বা সহজ শর্তে ঋণ না পেলে নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আর আগ্রহী হবে না”।
শোল্লা এলাকার মৃৎশিল্পী মিঠু পাল আক্ষেপ করে বলেন, “প্লাস্টিক পণ্য বাজার দখল করে নেওয়ায় মাটির কদর কমেছে অথচ মাটির তৈরি পণ্য পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত। আমাদের এই প্রাচীন শিল্পকে রক্ষায় সরকারের এগিয়ে আসা উচিত”।
মৃৎশিল্পীদের সহায়তার বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি পরিবারকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ ও অনুদান দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যদেরও এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে”।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেন্টু কুমার বড়ুয়া বলেন, “সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মৃৎশিল্পীদের জন্য আলাদা করে কোনো প্রণোদনা নেই। তবে ভবিষ্যতে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে তাদের প্রণোদনা দেওয়া যাবে”।
মৃৎশিল্পীরা মনে করেন, প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই প্রাচীন শিল্প টিকিয়ে রাখা সম্ভব। বাংলা নববর্ষের মতো ঐতিহ্যবাহী উৎসবকে সামনে রেখে মাটির পণ্যের চাহিদা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই শিল্পের ভবিষ্যৎ অনেকটা অনিশ্চিত।