রহিম শুভ, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৪০ এএম
ঠাকুরগাঁয়ের মাঠে বাতাসে দোল খাচ্ছে পেঁয়াজের সাদা ফুল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
অন্যান্য ফসলের তুলনায় লাভজনক হওয়ায় ‘কালো সোনা’ নামে পরিচিত পেঁয়াজ বীজের আবাদ বেড়েছে ঠাকুরগাঁও জেলায়। গত বছর ভালো ফলনের পাশাপাশি ভালো দাম পাওয়ায় পেঁয়াজ বীজ আবাদে আগ্রহ বেড়েছে এ জেলার কৃষকদের। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি বছর ভালো ফলনের পাশাপাশি প্রায় ২২২ কোটি টাকার পেঁয়াজ বীজ বিক্রির সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ।
ঠাকুরগাঁও জেলার মাঠজুড়ে দোল খাচ্ছে সাদা ফুল, দূর থেকে দেখতে অনেকটা কদম ফুলের মতো লাগলেও এর ভেতর লুকিয়ে আছে ‘কালো সোনাখ্যাত’ পেঁয়াজের বীজ। এ চিত্র চোখে পড়ে এখন জেলার বিভিন্ন এলাকায়। ফুলের রঙ সাদা হলেও শুকানোর পর বীজটি কালো রঙের হয়ে যায়। মৌমাছি কম থাকায় এখন হাতের স্পর্শে কৃত্রিমভাবে পরাগায়নের চেষ্টা করছে কৃষকরা। কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করার ফলে ফলনও ভালো হচ্ছে বলে জানান কৃষকরা। পেঁয়াজের বীজের আবাদ বাড়ায় এখানে কর্মসংস্থানও বেড়েছে।
সাধারণত নভেম্বর মাস বীজতলায় বা জমিতে পেঁয়াজ বীজ বপনের সময়। বীজ পরিপক্ব হতে সময় লাগে ১৩০ দিন। পরাগায়ন না হলে পেঁয়াজ ফুলে পরিপক্বতা আসে না। আর এসব ফুলে পরাগায়নের প্রধান মাধ্যম হলো মৌমাছি। পোকার আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষকরা ক্ষেতে কীটনাশক ছিটান। কিন্তু সেই কীটনাশকে মারা পড়ছে উপকারী পোকা ও মৌমাছি। এ কারণে পেঁয়াজ বীজের ক্ষেতে দিন দিন মৌমাছির আনাগোনা কমে যাচ্ছে। তাই হাতের স্পর্শে কৃত্রিমভাবে পরাগায়ন করেন কৃষকরা।
কথা হয় পেঁয়াজের বীজচাষি মো. কামালের সাথে। তিনি বলেন, গত বছর ৪ একর জমিতে পেঁয়াজের বীজ চাষ করে দ্বিগুণ লাভবান হয়েছি। তাই এবার ৯ একর জমিতে বীজ চাষ করেছি। আমার পেঁয়াজের বীজ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা নিয়ে যায়। এ উপজেলার মাটি ও আবহাওয়া পেঁয়াজ বীজ চাষে উপযোগী। প্রতিদিন আমার ক্ষেতে প্রায় ২৫/৩০ জন লোক কাজ করে গাছে পরাগায়ন করে। পুরুষ পায় ৪৫০ টাকা আর মহিলারা পায় ৩০০ টাকা। এইবার সব খরচ বাদ দিয়ে ৯ একর জমিতে ২০/২৫ লাখ টাকা লাভ হবে।

সদর মথরাপুর গ্রামের পেঁয়াজ বীজচাষি আমিনুর রহমান বলেন, আমি এবার ৩ একর জমিতে বীজ চাষ করছি। এইবার প্রথম। এর আগের বছর অনেক কৃষক লাভবান হয়েছে। তাই আমিও শুরু করছি। আশা করি, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও অনেক লাভবান হব।
রায়পুর ইউনিয়নের আরেক কৃষক জিতেন চন্দ্র বলেন, পেয়াজবীজ চাষে খরচ অনেক। প্রতিদিন পানি দিতে হয়। শ্রমিক নিতে হয়। শুরুতে প্রচুর খরচ করতে হয়। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া ভালো আছে। বীজের দামও ভালো আছে। আশা করি, এবারও লাভবান হব।
ক্ষেতে কাজ করা শ্রমিক জয়া রাণী বলেন, আমরা ২৫/৩০ জন প্রতিদিন কাজ করি। ছেলেদের বেতন বেশি। আমাদের কম। আমরা গাছে পরাগায়ন করি। বীজতলায় পানি দেই। কীটনাশক স্প্রে করি।
গীতা রাণী নামে আরেকজন নারী শ্রমিক বলেন, এই সময় হামরা বাড়িত বসে থাকি। কাজ কাম তেমন থাকে না। এইঠে হামার অনেকজনের কাজ হইছে। প্রতিদিন কাজ করে ৩০০ টাকা করে পাই। সংসারে খরচ করি। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাই।

শ্রমিক আকাশ আলী বলেন, গত বছর এত পেঁয়াজ বীজের আবাদ ছিল না। এবার চারগুণ বেশি জমিতে আবাদ হয়েছে। এতে আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। এই সময় আমরা বেকার হয়ে বাড়িতে বসে থাকতাম।
ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) আলমগীর কবির বলেন, বাজারে পেঁয়াজের কালো বীজ বিক্রি হয় উচ্চ দামে। তাই কালো সোনা খ্যাত পেঁয়াজ বীজ আবাদে আগ্রহ বেড়েছে এ জেলার কৃষকদের। পাশাপাশি কর্মসংস্থানও হয়েছে অনেকের।
গত বছর ঠাকুরগাঁও জেলায় ৫৯০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের বীজ আবাদ হয়েছিল। আর এ বছর পেঁয়াজের বীজ আবাদ হয়েছে ১ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে।