সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪৯ পিএম
নিকলীর পালপাড়ায় ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের কাজ করছেন এক কারিগর পরিবার। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্লাস্টিক ও মেলামাইন পণ্যের দাপটে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। একসময় যে শিল্প ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা এখন বিলুপ্তির পথে। পালপাড়ার মৃৎশিল্পী পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তিন দশক আগেও মাটির তৈরি থালা, বাসন, কলস ও হাঁড়ি-পাতিল ছিল গ্রামীণ জীবনের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সস্তা ও টেকসই প্লাস্টিক পণ্যের কারণে মাটির পণ্যের চাহিদা প্রায় হারিয়ে গেছে।
সরেজমিনে পালপাড়ায় দেখা যায়, কারিগররা এখনও মাটি দিয়ে পুতুল, খেলনা, ফুলের টব ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস তৈরি করছেন। তবে বিক্রির অভাবে তাদের জীবন-জীবিকা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে সহজে মাটি সংগ্রহ করা গেলেও এখন তা কিনতে হয় বেশি দামে। পাশাপাশি জ্বালানি, রঙ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
একসময় বৈশাখ ও বিভিন্ন উৎসবে এই শিল্পে ব্যাপক আয় হলেও এখন তা কমে এসেছে অনেকটাই। কারিগরদের দাবি, আগে যেখানে আয় হতো ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, এখন তা নেমে এসেছে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায়।
পালপাড়ার ৯০ বছর বয়সী জোসনা রানী পাল জানান, একসময় এই এলাকায় প্রায় ৩০০ পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এখন সেই সংখ্যা কমে মাত্র ৩০টির মতো পরিবারে দাঁড়িয়েছে।
মৃৎশিল্পী গোপন চন্দ্র দাস বলেন, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, আগের মতো বিক্রি না থাকায় বাধ্য হয়ে বিকল্প কাজ খুঁজছেন অনেকেই।
জীবন পাল বলেন, প্লাস্টিক পণ্যের কারণে মাটির জিনিসের চাহিদা প্রায় শেষ। আগে যেখানে ১০টি বিক্রি হতো, এখন বিক্রি হয় মাত্র ২টি। সরকারি সহায়তা না থাকায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুলাল চন্দ্র পাল জানান, দীর্ঘদিনের এই পেশা ছেড়ে যেতেও পারছেন না, আবার চালিয়ে যাওয়াও কষ্টকর হয়ে উঠেছে। ফলে পরিবার নিয়ে চরম সংকটে দিন কাটছে তাদের।
সরস্বতী রানী বলেন, প্লাস্টিকের আধিপত্যে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প বিলুপ্তির পথে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন।
রতন পাল বলেন, একসময় বৈশাখী মেলায় ব্যাপক বিক্রি হলেও এখন তা অনেক কমে গেছে। আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য না থাকায় পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেহানা মজুমদার মুক্তি জানান, মৃৎশিল্প টিকিয়ে রাখতে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১২ জন কারিগরকে ৬ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এই শিল্প রক্ষায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং সহায়তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিবেশবান্ধব এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো জরুরি। নইলে হারিয়ে যেতে পারে হাজার বছরের মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য।