চম্পক কুমার, জয়পুরহাট
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩৪ পিএম
আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪০ পিএম
জয়পুরহাট সদর উপজেলার একটি ক্ষেতে সবুজ পাতার নিচে উঁকি দিচ্ছে লাল টকটকে স্ট্রবেরি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জমিতে আগে যেখানে শুধু আলু আর ধান চাষ হতো, সেখানে এখন বিপ্লব ঘটিয়েছে এক বিদেশি ফল। জালের বেষ্টনী আর নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে ওঠা এই ‘লাল সোনা’ এখন জয়পুরহাটের চাষিদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। একসময় শখের বশে চাষ করা স্ট্রবেরি এখন স্থানীয় কৃষকদের এনে দিয়েছে সচ্ছলতার হাসি।
এ জেলার সদর উপজেলার জামালপুর, চান্দা, কালিবাড়ী ও পাকারমাথাসহ কয়েকটি এলাকায় সারি সারি সবুজ পাতার নিচে উঁকি দিচ্ছে টকটকে লাল স্ট্রবেরি। আলু, ধান বা অন্যান্য ফসলের তুলনায় এই ফসল চাষে কম খরচে লাভ মিলছে প্রায় তিনগুণ। এ কারণে সেখানকার স্থানীয় কৃষকরা চিরাচরিত ফসল ছেড়ে স্ট্রবেরি চাষেই বেশি ঝুঁকছেন।
স্ট্রবেরিতে বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পচনশীল এই ফল দ্রুত বাজারজাত ও আধুনিক সংরক্ষণের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাষিদের দাবি, সরকারি তদারকি আর হিমাগার সুবিধা পেলে সেখানকার স্ট্রবেরি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব। এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, হিমাগার সুবিধা থাকলেও চাষিরা সেখানে এই ফল রাখেন না।
সরেজমিন দেখা গেছে, সকাল হতেই স্ট্রবেরি ক্ষেতে নারী-পুরুষ শ্রমিকরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। জমি নিড়ানো, সার দেওয়া, ওষুধ ছিটানোসহ বিভিন্ন কাজ করছেন তারা। আবার কেউ গাছ থেকে সংগ্রহ করছেন টকটকে লাল স্ট্রবেরি। রাস্তার ধারেই বসছে অস্থায়ী হাট। তবে বেশিরভাগ ফলই ক্ষেত থেকে তোলার পর যত্ন করে কার্টনজাত করা হচ্ছে। আকারে বড় ও সুস্বাদু এই স্ট্রবেরি ট্রাকে লোড দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে পাঠানো হচ্ছে।
চাষিরা জানান, কার্তিক-অগ্রহায়ণে প্রতি বিঘা জমিতে ৪ থেকে ৫ হাজার চারা রোপণ করতে হয়। চারা কেনা, জমি চাষ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে বিঘাপ্রতি খরচ হয় প্রায় ১ লাখ টাকা। ফাল্গুন থেকে পুরোদমে ফলন আসা শুরু হয়। আবহাওয়া অনুকূল এবং বাজারদর ঠিক থাকলে এক মাসের ব্যবধানে এক বিঘা জমি থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব। তবে কৃষি বিভাগ থেকে সহায়তা পেলে এ চাষ আরও বাড়বে বলে আশা তাদের।
চাষি সোহেল হোসেন বলেন, স্ট্রবেরি কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে লাগাতে হয়। আমি ধানের বদলে লাভজনক এই ফসল চাষ করি। এ বছর এক বিঘা জমিতে লাগিয়েছি। বিঘায় ১ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার ফল বিক্রি করা যায়। এতে আমার ২ লাখ টাকার মতো লাভ হবে।
আতাউল নামের আরেক চাষি বলেন, আমি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা থেকে আষাঢ় মাসের শেষের দিকে চারা কিনেছিলাম। প্রতিটি চারার দাম ২২ টাকা পড়েছিল। মোট ৬০০টি চারা কিনে এনেছিলাম। এতে ২ হাজার ৮০০ টাকা গাড়িভাড়া পড়েছিল। এই চারা লাগিয়ে আরও চারা করা হয়। পরে কার্তিক মাসের দিকে প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে ১০ হাজারের মতো চারা রোপণ করি। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়। আর বিক্রি করেছি প্রায় ৪ লাখ টাকার। আরও কিছুদিন ফল বিক্রি করা যাবে।
তিনি বলেন, স্ট্রবেরি রাখার মতো হিমাগার বা এ ধরনের কিছু থাকলে আমরা এগুলো রেখে সাত বা পনেরো দিন পর বিক্রি করতে পারতাম। এই সুবিধা না থাকায় আজ পাকলে আজই তুলতে হচ্ছে, না তুলতে পারলে নষ্ট হয়ে যচ্ছে। এটি আমাদের সমস্যা।
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, জয়পুরহাটের এই ফলের মান খুবই ভালো। আবহাওয়ার কারণে এবার ফলের ধরন কম, এজন্য বাজারে দাম একটু বেশি। স্ট্রবেরি তো বেশিদিন রাখা যায় না। সংরক্ষণ করতে পারলে ভালো, কিন্তু সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় ১৫ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয়। আর উৎপাদন হয়েছে ১৮১ টন। এবার ২০২৫-২৬ মৌসুমে এই ফসল চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ হেক্টর এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ১৮০ টন। ইতোমধ্যে ১৩ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক একেএম সাদিকুল ইসলাম বলেন, কৃষক ভাইয়েরা ভালো দাম পাওয়ার কারণে দিন দিন এ ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। আশা করছি, আগামী বছর এই ফসলের আবাদ ২০ হেক্টর করতে পারব।
তিনি বলেন, স্ট্রবেরি খুবই সফ্ট। একটু আঘাত পেলে পচনের দিকে চলে যায়। এজন্য আমরা কৃষক ভাইদের পরামর্শ দিচ্ছি, স্ট্রবেরি সাথে সাথে বিক্রি না হলে আমাদের দুটি মিনি কোল্ড স্টোরেজ আছে। সেখানে তারা স্ট্রবেরি সংরক্ষণ করতে পারেন।