লামা-আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:৫৯ এএম
লামা শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকা এই তুইল্লার পাহাড় এখন অপরাধ, ভূমি দখল, হত্যা, অস্ত্র ও মাদকের কেন্দ্রস্থল।
বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ হাইদারনাশী ‘তুইল্লার পাহাড়’Ñ নামটি এখন আতঙ্কের। নির্জন পাহাড়টি আজ পরিণত হয়েছে সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু ও অপরাধীদের অভয়ারণ্যে। একসময় পাহাড়টিতে জনবসতি থাকলেও এখন ডাকাত-সন্ত্রাসীদের অবাধ বিচরণে অপরাধের আঁতুরঘর হওয়ায় ভয়ে পালিয়ে গেছে অনেক পরিবার। যে কয়টি পরিবার এখনও রয়েছে, তারা সন্ত্রাসীদের নিয়মিত চাঁদা ও মাসোহারা দিয়ে টিকে আছে।
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের গুলিস্তান বাজারের সন্নিকটে সবার চোখের সামনেই গড়ে উঠেছে বিশাল অবৈধ সাম্রাজ্য। ডাকাতি, মাদক বিক্রি, ভূমিদখল, চাঁদাবাজি, সরকারি রিজার্ভ উজাড়, গুম ও হত্যাসহ সব অপরাধ সংগঠিত হয় এখানে। প্রায় তিন একর পাহাড়ি খাসজমি দখল করে বসতি গড়ে উঠলেও এখন তা অপরাধীদের চারণভূমি।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পলাতক অপরাধীরা এসে এখানে আশ্রয় নেয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের আন্তঃজেলা ডাকাত দলের আনাগোনা রয়েছে এখানে। জায়গাটি কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা সীমানাবর্তী হওয়ায় অপরাধীদের জন্য অনেক নিরাপদ। নাম প্রকাশ না করা শর্তে স্থানীয় অনেকে বলেন, চকরিয়া উপজেলার ডুমখালী ও রিজার্ভ পাড়ার চিহ্নিত ডাকাতরা সব সময় এখানে অবস্থান করে। রাত নামলেই এলাকাটি ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলহাজারা ইউনিয়নের মাইজপাড়া এলাকায় গভীর রাতে ডাকাতির ঘটনায় অভিযানের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছরোয়ারের (নির্জন) ঘাড়ে ডাকাত ছুরিকাঘাত করে।
তুইল্লার পাহাড়ে অবস্থান করা ডাকাতরা এই এলাকার সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হয়। এদের গডফাদার হিসেবে রয়েছে গুলিস্তান বাজার এলাকার কিছু জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ী। যারা এই সন্ত্রাসীদের তথ্য ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করে এবং তাদের সঙ্গে রয়েছে নিয়মিত উঠাবসা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ হাইদারনাশী গ্রামের কয়েকজন জানায়, আন্তঃজেলা ডাকাত দলের প্রায় ৪০ সশস্ত্র সন্ত্রাসী এই দলে রয়েছে। তাদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র, রাম-দা, কিরিচ, ছুরি বিভিন্ন অস্ত্র রয়েছে। এলাকার কিছু প্রভাবশালী তাদের অসৎ স্বার্থ আদায়েও তাদের ব্যবহার করে। গুলিস্তান বাজার কেন্দ্রিক গড়ে উঠা অপরাধ দমনে কুমারী ফাঁড়ির পুলিশের ভূমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
একসময় তুইল্লার পাহাড়ে বসবাস করতেন এমন একজন জানান, সন্ত্রাসীরা আমার পরিবারের কাছে ৪ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। আমরা দিতে না পারায় তাদের ভয়ে বসতবাড়ি ও জায়গা জমি ফেলে চলে আসি। স্থানীয় কয়েক জনপ্রতিনিধির কাছে বিচার দিলেও তারা আমাদের বিচার করেনি। সন্ত্রাসীদের নিয়মিত যোগাযোগ ও সম্পর্ক রয়েছেÑ যা এলাকায় এখন ওপেন সিক্রেট। তুইল্লার পাহাড়ে ৯টি পরিবার বসবাস করত। তাদের ভয়ে তিন পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। এখন যে ৬ পরিবার আছে তারা চাঁদা ও মাসোহার দিয়ে টিকে আছে। যদিও প্রাণের ভয়ে তারা মুখ খুলতে চাইছে না।
ওই এলাকার এক সচেতন ব্যক্তি জানান, কিছুদিন আগে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে ডাকাতি করতে গিয়ে সন্ত্রাসীরা এক নারীর শ্লীলতাহানি করে। যদিও লোকলজ্জা ও প্রাণনাশের ভয়ে তারা মুখ খুলেনি। এই সন্ত্রাসীদের ছত্রছায়ায় গুলিস্তান বাজারে সুনীল দাশসহ দুই দোকানে প্রকাশ্যে মদ ও গাঁজা বিক্রি হয়। রাত নামলেই ইয়াবার ছড়াছড়ি। পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ হিন্দু পাড়ার বিদ্যুৎ ও গলাচিরার ভান্ডারি হারুণের বাড়িতে প্রকাশ্যে মদ-গাঁজা বিক্রি হয়।
লামা শহর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকা এই তুইল্লার পাহাড় এখন অপরাধ, ভূমি দখল, হত্যা, অস্ত্র ও মাদকের কেন্দ্রস্থল। প্রশাসনের দৃঢ় পদক্ষেপ না এলে এই ভয়ংকর সাম্রাজ্য আরও বিস্তৃত হবে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। দেশের ভেতর এই ‘অন্যদেশ’-কে পুনরুদ্ধার করতে হলে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও শক্ত অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সুসংগঠিত যৌথ অভিযান।
লামা থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মুহাম্মদ শাহজাহান কামাল বলেন, জন-নিরাপত্তা সবার আগে। আমাদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করলে পুলিশ অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করবে। ওই এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণে আমাদের নিয়মিত অভিযান ও পুলিশি কার্যক্রম চলমান রয়েছে।