মো. শামীম মিয়া, নরসিংদী
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৪ এএম
আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৬ এএম
নরসিংদীর ২৫০ শয্যার হাসপাতাল ভবনের নির্মাণকাজ আট বছরেও শেষ না হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ব্যাহত হচ্ছে এবং ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
নরসিংদীতে ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করার লক্ষ্যে নির্মিত নতুন ভবনের কাজ দীর্ঘ ৮ বছরেও সম্পন্ন হয়নি। ফলে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার বাসিন্দারা।
২০১৮ সালে প্রায় ৪০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩তলা ফাউন্ডেশন-বিশিষ্ট ৮তলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হয়। বর্তমানে ভবনের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে গণপূর্ত বিভাগ। তবে এখনও রঙ করা, বেসিন ও বাথরুম ফিটিংস, লিফট স্থাপনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এসব সরঞ্জাম এখনও স্থাপন করা হয়নি। ভবনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝে নেওয়ার তারিখ নির্ধারিত হলে এক মাসের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করা সম্ভব বলে জানানো হয়েছে।
বর্তমানে ভবনের ৮ম তলায় ডায়ালাইসিস সেন্টার নির্মাণের কাজ চলছে। ইটের গাঁথুনি শেষ হয়ে প্লাস্টার, টাইলস ও দরজা স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। শ্রমিকরা আশা করছেন, স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই অংশের কাজ সম্পন্ন হবে।
মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবনের বিভিন্ন তলায় জরুরি বিভাগ, আউটডোর, প্যাথলজি, অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ, সিসিইউ, প্রশাসনিক ব্লক, ওয়ার্ড এবং ডায়ালাইসিস ও আইসোলেশন ইউনিট স্থাপন করা হবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এমএন হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের ম্যানেজার কামাল উদ্দিন জানান, তাদের দায়িত্ব অনুযায়ী কাজ ২০২২ সালেই সম্পন্ন করে তারা হস্তান্তর করেছে। তবে পরবর্তীতে কিছু অতিরিক্ত কাজ নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে চলছে, যা মূল প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত নয়।
নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গণপূর্ত বিভাগরে তত্ত্বাবধানে নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ প্রকল্পের নতুন ভবনটির নির্মাণ কাজ শুরু করেন ২০১৮ সালে। ৪০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বাজেটের এই কাজটি পায় এমএন হুদা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ১৩তলা ফাউন্ডেশনের নির্মাণাধীন আটতলা ভবনের প্রথম তলায় থাকবে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ, রিসেপশন ও রান্নাঘর। দ্বিতীয় তলাজুড়ে থাকবে আউটডোরের ১৮টি কক্ষ, তেতলায় থাকবে রেডিও ডায়াগনস্টিক ও প্যাথলজি। চতুর্থ তলায় অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও সিসিইউ। পঞ্চম তলায় স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগ এবং ২৮ শয্যা মহিলা ওয়ার্ড। ষষ্ঠ তলায় প্রশাসনিক অফিস (অ্যাডমিন ব্লক) ও ক্যান্টিন। সপ্তম তলায় থাকবে ৫৮টি ওয়ার্ড। এ ছাড়াও অষ্টম তলায় থাকবে ডায়ালসিস সেন্টার ও আইসোলেশন ইউনিট।
নরসিংদী গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ এস এম মুসা জানান, নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ এখন পর্যন্ত ৯০ ভাগ সমাপ্ত হয়েছে। তবে চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভবনের ভিতর বেসিন, বাথরুমের কমোড, লাইট, ফ্যান, লিফ্ট ইত্যাদি লাগানো হয়নি। এ ছাড়াও রঙ করার কাজ বাকি রয়েছে।
অন্যদিকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, শতভাগ কাজ শেষ না করেই ভবন বুঝে নিতে বলা হচ্ছে। তারা পূর্ণাঙ্গ কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ভবন গ্রহণে অনিচ্ছুক এবং এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ভবন নির্মাণ শেষ হলেও সেবা চালু করতে প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র ও প্রশাসনিক অনুমোদন এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। এজন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে এবং প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এ এন এম মিজানুর রহমান জানান, শতভাগ কাজ শেষ না করেই কেন আমাকে গণপূর্ত বিভাগ ভবন বুঝে নেওয়ার জন্য চিঠি দিচ্ছে তা আমি বুঝতে পারছি না। ভবনটির শতভাগ কাজ সম্পন্ন হলে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে তবেই ভবনটি বুঝে নেওয়া হবে। এ ছাড়াও ভবনটির কাজ সম্পন্নের বিষয়ে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী এখনও শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়নি। কাজ চলমান রয়েছে।
সুজন সুশাসনের জন্য নাগরিক-এর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হলধর দাস বলেন, মানুষের চিকিৎসাসেবা বৃদ্ধির জন্য নরসিংদী ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের জন্য আটতলা বিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে এখনও লোকবল নিয়োগ হলো না, যন্ত্রপাতিও এলো না। তাই যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালটি চালু করতে যা যা প্রয়োজন, তা করার দাবি জানাচ্ছি।
সব মিলিয়ে, নরসিংদীর এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং অবকাঠামোগত অসম্পূর্ণতার কারণে এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করে হাসপাতালটি চালু করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সবাই।