মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪০ এএম
ভুক্তভোগী নুরেজা বেগম। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রংপুরের মিঠাপুকুরে পৈতৃক জমি দখলকে কেন্দ্র করে নুরেজা বেগম (৫৫) নামে এক বৃদ্ধাকে বেধড়ক মারধর, ঘরবাড়ি ভাঙচুর এবং বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করার অভিযোগ উঠেছে তার সৎ ছেলেদের বিরুদ্ধে।
উপজেলার লতিবপুর ইউনিয়নের সাদুল্যাপুর গ্রামে শুক্রবার দুপুরে এই ঘটনা ঘটে।
দফায় দফায় গ্রাম আদালত ও পুলিশি সালিশ হলেও ছেলেদের পেশিশক্তির দাপটে নিজ ঘরে ফিরতে পারছেন না এই অসহায় বৃদ্ধা।
ভুক্তভোগী নুরেজা বেগম ওই গ্রামের মৃত বছিম উদ্দিনের স্ত্রী।
শনিবার সকালে সরেজমিনে সাদুল্যাপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। শুক্রবারের হামলার পর বৃদ্ধা নুরেজা বেগম তার নিজ ঘরে ঢুকতে না পেরে বাড়ির পাশে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর অবস্থায় বসে আছেন। তার চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। ভাঙচুর করা ঘরের আসবাবপত্র উঠানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে।
স্থানীয়দের উপস্থিতিতে বৃদ্ধা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, সারারাত তিনি নিরাপত্তাহীনতায় অন্যের আশ্রয়ে ও খোলা জায়গায় কাটিয়েছেন, তবুও ছেলেরা তাকে ভিটায় ঘেঁষতে দিচ্ছে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নুরেজা বেগমের নামে থাকা পৈতৃক বসতভিটার জমিটুকু দখল করতে দীর্ঘদিন ধরে মরিয়া হয়ে উঠেছে তার তিন সৎ ছেলে আলমগীর হোসেন (৪৫),বাবুল মিয়া (৩২) এবং নুর আলম (৩০)।
নুরেজা বেগমকে জমি থেকে বঞ্চিত করতে গত কয়েক মাস ধরে তার ওপর ধারাবাহিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আসছে তারা। কয়েক দফায় তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং তিনি বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করলেই চালানো হয় হামলা। অধিকার ফিরে পেতে নুরেজা বেগম স্থানীয় লতিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালত ও মিঠাপুকুর থানায় একাধিকবার অভিযোগ করেন। জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে কয়েক দফা সালিশি বৈঠক করলেও অভিযুক্তরা কোনও সিদ্ধান্তই মানছেন না।
শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয়রা মানবিক কারণে নুরেজা বেগমকে তার নিজ বাড়িতে তুলে দিয়ে আসেন। কিন্তু গ্রামবাসী চলে যাওয়ার পরপরই অভিযুক্ত ছেলেরা আবারও ক্ষিপ্ত হয়ে বৃদ্ধার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে মারধর করে এবং ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে পুনরায় বসতভিটা থেকে বের করে দেয়। এ সময় স্থানীয় লোকজন বাধা দিতে গেলে তাদেরও হেনস্তার শিকার হতে হয়।
কান্নায় ভেঙে পড়ে নুরেজা বেগম বলেন, “ছেলেরা আমার জমির লোভে আমাক মারি ফালাবার চায়। মুই কই যামু? মুই সবার কাছে বিচার চাও। মুই নিজের বাড়িত শান্তিতে থাকতে চাও। ওমাক কি দেখার কাইও নাই?”
লতিবপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য ও গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান আলমগীর কবির বলেন, “দফায় দফায় বিচার করা হয়েছে এবং প্রতিবেদন ওই নারীর পক্ষেই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ছেলেরা কোনও আইন বা বিচার মানছে না। ইমাম ও মুসল্লিদের সামনে তাকে রেখে আসার পরপরই আবারও তাকে মারধর করা হয়েছে। আমি এর স্থায়ী সমাধান ও আইনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ছেলে আলমগীর হোসেন, বাবুল মিয়া এবং নুর আলম বলেন, তিনি আমাদের সৎ মা। জমি যতই তার নামে থাক আমরা তাকে এখানে থাকতে দিব না। এতে ওনার যা করার আছে করুক। এনার পক্ষে কে বের হবে সেটাই দেখব। আমাদের বিষয়ে যেন কেউ নাক গলাতে না আসে। নয়তো পরিণাম ভালো হবে না।
এ বিষয়ে মিঠাপুকুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নুরুজ্জামান জানান, “বিষয়টি সম্পর্কে পুলিশ অবগত রয়েছে। ইতিপূর্বে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। নতুন করে আবারও অভিযোগ পেয়েছি, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”