রাসেল আহমদ, মধ্যনগর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৮ এএম
আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০১ এএম
সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের আকাশে উড়ছে শামুকখোল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
হাওরের নীল জলরাশির বুকে ভেসে থাকা তৃণভূমি বা কান্দায় দলবেঁধে নামে অসংখ্য পাখি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় হেলিপ্যাডে যেন হেলিকপ্টার নামছে। বাতাসের দোলায় ডানার ঝাপটানি দিয়ে আকাশে পেজা তুলোর মেঘপুঞ্জের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে অসংখ্য পাখি। কেউ বসে আছে ধ্যানে, কেউ বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে, কেউ নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে। কেউ আবার খাবার সন্ধানে উড়ছে আকাশজুড়ে। এ যেন অঘোষিত শামুকখোল পাখির অভয়ারণ্য। এ অভয়ারণ্য সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে।
জেলার মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলার প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট। ভারতের মেঘালয় পর্বতমালার পাদদেশ-সংলগ্ন স্বচ্ছ নীলজলের এ হাওর সারা বিশ্বে জীববৈচিত্র্যে ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য। এ হাওরের সুবিশাল হিজল-করচ বাগানের গাছে গাছে শামুকখোল পাখি সংসার পেতেছে। তারা এখানে নিরাপদ প্রজননের অনুকূল পরিবেশ পেয়ে বংশবিস্তার করায় দিন দিন বাড়ছে এ পাখির সংখ্যা। ভোরের আলো উঁকি দিতে খোলা আকাশে ডানা মেলে দেয় ঘুম ভাঙানিয়া পাখার ঝাপটানি। দিনের বার্তায় ঘুম ভাঙিয়ে দলবেঁধে চলে যায় খাদ্য আহরণে। গোধূলি বিকালে শোঁ-শোঁ শব্দের মিষ্টি কলতানে আবার ফেরে নীড়ে। এভাবে চলে তাদের সংসার।
জানা গেছে, শামুকখোল সারস জাতীয় পাখি। পৃথিবীতে দুই প্রজাতির শামুকখোল রয়েছেÑ একটি এশীয় শামুকখোল, অপরটি আফ্রিকান শামুকখোল। টাঙ্গুয়ার হাওরে বিচরণকারীরা মূলত এশীয় শামুকখোল বা শামুকভাঙা পরিবারের অন্তর্গত এক প্রজাতির শ্বেতকায় বৃহদাকৃতির পাখি। এশীয় শামুকখোল একটি বিরল প্রজাতির, কারণ এর কোনো উপপ্রজাতি নেই। উপযুক্ত আবহাওয়া, পরিমিত খাবারের জোগান আর নিরাপত্তা থাকলে এরা সাধারণত কোনো এক জায়গা থেকে নড়ে না। কম বয়সী শামুকখোলরা উড়তে শেখার পর বিশাল অঞ্চল পরিভ্রমণ করে।
বাংলাদেশের হাওর, বিল, মিঠাপানির জলা, হ্রদ, ধানক্ষেত, উপকূলীয় প্যারাবন ও নদীর পাড়ে বিচরণ করে। এরা সচরাচর ছোট ঝাঁকে থাকে। বড় কলোনিতে রাত্রিবাস ও প্রজনন করে। এশীয় শামুকখোল আকারে বেশ বড়সড়। এ পাখির দৈর্ঘ্য ৮১ সেন্টিমিটার এবং এর পাখার দৈর্ঘ্য হয় ৪৪ সেন্টিমিটার। শামুকখোলের দেহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে ঠোঁট। প্রায় ১৪ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য দুই ঠোঁটের মাঝে ফাঁকা থাকে।
বর্ষাকালের শেষ দিকে শামুকখোলের প্রজনন ঋতু শুরু হয়। মূলত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস এদের প্রজনন মৌসুম। স্থানভেদে প্রজনন ঋতুতে বিভিন্নতা দেখা দেয়। যে বছর খরা হয়, সে বছর এরা সাধারণত প্রজনন করে না। বক, পানকৌড়ি, গয়ার প্রভৃতি পাখির সঙ্গে মিশে কলোনি করে বাসা বানায়। এমনকি গ্রামীণ বনেও এ ধরনের কলোনি দেখা যায়। স্ত্রী ও পুরুষ দুজনে মিলে গাছের ডালপালা দিয়ে বড় মাচার মতো আগোছাল বাসা বানায়। বাসা বানানো শেষে ডিম পাড়ে। এরা সাধারণত ২-৫টি ডিম দেয় এবং ২৫ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে ছানা বের হয়।
বন্য প্রাণী গবেষক ও পাখি বিশেষজ্ঞ সীমান্ত দীপু বলেন, শামুকখোল এখন দেশের বিভিন্ন খাল-বিল এবং নদীর কাছাকাছি এলাকাগুলোয় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে। এরা প্রজনন শেষে আর দেশের বাইরে যাচ্ছে না। ফলে দেশের আনাচে-কানাচে সহজেই এ পাখির দেখা পাওয়া যাচ্ছে। শামুকখোল এশিয়া মহাদেশের আদি প্রজাতির একটি পাখি। বাংলাদেশে শামুকভাঙা পাখি নামে পরিচিত। তিনি আরও বলেন, এ পাখি মূলত গ্রীষ্মকালীন এদেশে আসত। এজন্য এদের পরিযায়ী পাখি বলা হতো। কিন্তু এখন এরা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, তাই এদের দেশীয় পাখি হিসেবে গণ্য করা হয়।
বাংলাদেশ বার্ডস ক্লাবের তথ্যানুযায়ী, টাঙ্গুয়ার হাওর ছাড়াও সিলেট অঞ্চলের অন্যান্য হাওর এলাকা, রাজশাহীর দুর্গাপুর, নাটোরের পচামারিয়া ও পুটিয়া, ফেনী, নওগাঁর সান্তাহার ও বগুড়ার নিয়ামতপুর, রামনগর, গন্ধর্বপুর, মহাদেবপুর, টাঙ্গাইলের পাহারকাঞ্চনুর নলুয়া, জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এই পাখি ছোট দলে প্রজনন ও বিচরণ করে।