রাসেল মাহমুদ, বরগুনা
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:০০ পিএম
আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:০৩ পিএম
ডিজেল সংকটে সাগরে যেতে পারছে না গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না শতাধিক ট্রলার।, বিপাকে জেলে পরিবার। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
উপকূলীয় জেলা বরগুনার পাথরঘাটায় তীব্র ডিজেল সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে মৎস্য খাত। দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বিএফডিসিতে, যেখানে প্রতিদিন শত শত মাছভর্তি ট্রলারের ভিড় থাকত, সেখানে এখন নেমে এসেছে অচলাবস্থা।
গত তিন-চার দিন ধরে জ্বালানি সংকটের কারণে গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না শতাধিক ট্রলার।
শুধু সমুদ্রগামী ট্রলার নয়, সংকট আরও গভীর হয়েছে নদ-নদীতে মাছ ধরা ক্ষুদ্র জেলেদের মধ্যেও।
টানা প্রায় ১৫ দিন ধরে নদীতে যেতে না পারায় তাদের জীবন-জীবিকায় নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
অতিরিক্ত দামে ডিজেল বিক্রির অভিযোগ
এ পরিস্থিতিতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে অতিরিক্ত দামে ডিজেল বিক্রির অভিযোগ।
পাথরঘাটায় ব্যারেলপ্রতি দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা বেশি দামে জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা। তাদের দাবি, অতিরিক্ত টাকা না দিলে প্রয়োজনীয় তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
ছোট নৌকার জেলেরা আরও বেশি বিপাকে পড়েছেন।
কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, পাম্প থেকে কন্টেইনার বা বোতলে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় তারা কার্যত অচল হয়ে পড়েছেন।
বাড়ছে দাদন ও ঋণের চাপ
ঈদের আগ থেকেই তেল সংকটে বন্ধ রয়েছে তাদের মাছ ধরার কার্যক্রম। ফলে আয় বন্ধ থাকলেও দাদন ও এনজিও ঋণের চাপ বাড়ছে বলেও উল্লেখখ করেন তারা।
জেলা মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৬ হাজার ৪২১ জন। এর মধ্যে ২৭ হাজার ২৫০ জন সমুদ্রগামী এবং ১০ হাজারের বেশি ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকা রয়েছে অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে।
এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখন জ্বালানি সংকটের কারণে বিপর্যস্ত।
স্থানীয় জেলে মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, “ছোট নৌকার জন্য পাম্প থেকে তেল পাওয়া যায় না। গাড়িতে যারা আসে তারা তেল পেলেও আমরা বোতলে নিতে পারি না। নৌকা বন্ধ, আয় বন্ধ তাই ঘরে খাবারও নেই।”
জেলে কার্ডের মাধ্যমে তেল সরবরাহের দাবি
মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি রুহুল আমিন জানান, ডিজেলের অভাবে অন্তত ১৫০ জন জেলে বর্তমানে বেকার হয়ে পড়েছেন এবং পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
তিনি জেলে কার্ড দেখিয়ে তেল সরবরাহের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
জেলে খালেক সিকদার বলেন, “দিন এনে দিন খাই। ট্রলার সাগরে না গেলে আয় নেই। তিন দিন ধরে বসে আছি, সব প্রস্তুত, শুধু ডিজেলের জন্য যেতে পারছি না।”
তেল ব্যবসায়ী ফারুক মিয়া জানান, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কোটা ভিত্তিতে সরবরাহ দেওয়া হলেও চাহিদার তুলনায় তা অত্যন্ত কম।
যেখানে সাপ্তাহিক চাহিদা ২ থেকে ২.৫ লাখ লিটার, সেখানে বর্তমানে মাত্র পাঁচ হাজার লিটার সরবরাহ করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কঠোর ব্যবস্থা
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জিয়া উদ্দিন জানান, সমুদ্রগামী ট্রলারের জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে ছোট নৌকার জেলেদের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বরগুনা জেলা প্রশাসক মিজ্ তাছলিমা আক্তার বলেন, কেউ জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
উপকূলের এই সংকট কেবল জ্বালানির নয়, এটি হাজারো জেলে পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে এই সংকট আরও গভীর হয়ে পড়বে।