প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৬ ১৩:১৯ পিএম
আয়তনে ছোট হলেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইরানের খার্গ দ্বীপ। ছবি: দ্য টেলিগ্রাফ
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য স্থল অভিযানের আশঙ্কায় পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপে প্রতিরক্ষা জোরদার করেছে ইরান। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, দ্বীপটিতে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি মাইন ও নানা ধরনের ফাঁদ বসানো হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপটি দখলের পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। উল্লেখ্য, ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের মাধ্যমে রপ্তানি হয়।
তবে সামরিক বিশ্লেষকরা এই ধরনের অভিযানের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, দ্বীপটি ছোট হলেও অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং সেখানে বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান কাঁধ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র (ম্যানপ্যাডস) মোতায়েন করেছে, যা নিচ দিয়ে উড়া বিমান ও হেলিকপ্টারের জন্য বড় হুমকি।
এ ছাড়া দ্বীপের চারপাশে বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় সাঁজোয়া যান ধ্বংসে সক্ষম ল্যান্ডমাইন ও বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক ফাঁদ পাতা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী যদি সেখানে অবতরণের চেষ্টা করে, তাহলে কঠিন প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের ভেতরেও এই অভিযান নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। কিছু মিত্র ও নীতিনির্ধারক প্রশ্ন তুলেছেন শুধু এই দ্বীপ দখল করেই কি হরমুজ সংকট বা জ্বালানি বাজারে ইরানের প্রভাব কমানো সম্ভব?
এর আগে ১৩ মার্চ মার্কিন বাহিনী দ্বীপটির প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল। তবে ট্রাম্প দাবি করেন, মানবিক কারণে তারা তেল অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত করেননি। ইসরায়েলি সূত্রের মতে, খার্গ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ঘটতে পারে। ন্যাটোর সাবেক কমান্ডার জেমস স্টাভরিডিস সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে তারা সর্বোচ্চ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
এদিকে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দেশের কোনো দ্বীপ দখলের চেষ্টা হলে শুধু আক্রমণকারী নয়, সহযোগী দেশগুলোর বিরুদ্ধেও পাল্টা হামলা চালানো হবে।
আয়তনে ছোট হলেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ দখলে নিতে হলে বড় আকারের সামরিক অভিযান প্রয়োজন হবে। এ লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ মোতায়েন করেছে, যেগুলো সমুদ্র থেকে দ্রুত স্থলভাগে অবতরণ ও আক্রমণে দক্ষ। পাশাপাশি ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইউনাইটেড স্টেটস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ড্রোন ও উপগ্রহের মাধ্যমে দ্বীপটির ওপর নজরদারি চালাচ্ছে। এতে ইরানের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির পরিবর্তনগুলো দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, দ্বীপটি ইরানের মূল ভূখণ্ডের খুব কাছে হওয়ায় সেখানে অবস্থান নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী সবসময়ই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে থাকবে। ফলে এই অভিযান কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে ওয়াশিংটনের ভেতরে বিতর্ক চলছে।
অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি স্থল অভিযানে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের পাল্টা হামলায় গোটা অঞ্চলের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সামরিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করে, স্থল অভিযান না চালিয়েও নৌ অবরোধের মাধ্যমে খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি বন্ধ করে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। এতে বড় ধরনের প্রাণহানির ঝুঁকি এড়ানো যাবে।