অষ্টমী স্নান
সাইফুল হক মোল্লা দুলু,মধ্যাঞ্চল
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১৫:২৬ পিএম
অষ্টমী স্নান উপলক্ষে বৃহস্পতিবার কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে পুণ্যার্থীদের ঢল নামে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় উৎসব অষ্টমী স্নান উপলক্ষে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে পুণ্যার্থীদের ঢল নেমেছে। পাপ মোচনের বাসনায় প্রতি বছর অষ্টমী তিথির পুণ্য লগ্নে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজারো পুণ্যার্থী ব্রহ্মপুত্র নদে ভিড় জমান স্নানোৎসবে।
পুণ্যার্থীরা বৃহস্পতিবার ভোরের আলো ফুটতেই নদীর তীরে ভিড় জমাতে থাকেন, যা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বাড়তে থাকে। হোসেনপুর উপজেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় এ আয়োজন করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ হোসেনপুর উপজেলা ও পৌর শাখা।
উৎসবকে ঘিরে নদীর তীরজুড়ে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরাও দায়িত্ব পালন করেন।
হোসেনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক প্রদীপ কুমার সরকার, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. জহিরুল ইসলাম মবিনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
‘হে ভগবান ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্র, আমার পাপ হরণ করো’ পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ করে ফুল, কলা, আম, ডাব, হরতকিসহ পুণ্যার্থীরা ভক্তিমন্ত্রের সঙ্গে সঙ্গে মেতে উঠেন স্নানোৎসবে। নারী-পুরুষ পুণ্যার্থীরা হোসেনপুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় ভিড় করেন।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতে, সারা বছরের গ্লানি আর পাপ মোচন করতে পূর্ণতীর্থ অষ্টমী স্নানের মধ্য দিয়ে নিজেকে নিষ্পাপ করতে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নানের আয়োজন করা হয়।
হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ মহাভারত থেকে পাওয়া, পশুরাম তার মা রেনুকা দেবীকে কুড়াল দিয়ে মারতে গেলে তার মা তাকে অভিশাপ দেন। সেই অভিশাপে তার হাতে সেই কুড়াল পাথরের মতো হয়ে যায়। আর সেই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পশুরাম দেবতার কাছে প্রার্থনা করলে পশুরামকে জানানো হয়- যেখানে গঙ্গা (ব্রহ্মপুত্র নদ) দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত, অষ্টমী তিথিতে সেখানে স্নান (ডুব দিয়ে গোসল) করলে তার পাপ মোচন হবে। পশুরাম সেই অষ্টমী তিথিতে স্নান করলে তার পাপ মোচন হয়, আর তার হাতে পাথর হয়ে থাকা কুড়ালটিও মুক্ত হয়ে গঙ্গা নদে পড়ে যায়। তখন থেকেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা অষ্টমী তিথিতে নিজের পাপ মোচনের জন্য ব্রক্ষ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান করে আসছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, স্নানের সময় ফুল, বেলপাতা, ধান, দূর্বা, হরিতকি, ডাব, আমপাতা নদীর পানিতে অর্পণ করছেন তারা। উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে মেলাও বসেছে। এদিকে দূর-দূরান্ত থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চলে এসেছেন নদের তীরে। বালুর ওপর তৈরি হয়েছে নানান রকম পণ্যের স্টল। নদীর কূল ধরে বসেছে বিভিন্ন রকমের দোকানপাট। মাটির জিনিসপত্র তো আছেই। পাশাপাশি উঠেছে মাটির তৈরি বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, পুতুল, বাঘ, আম, নৌকা, খুরমা বাতাসা, চিনির তৈরি জীবজন্তুর প্রতিকৃতি, হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য। মেলায় সব ধর্মের মানুষ বিভিন্ন ধরনের পণ্য কিনছেন। এই পুণ্যস্নানকে ঘিরে জেলাসহ আশপাশের জেলা-উপজেলা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে ব্যবস্থা নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এছাড়াও স্নানোৎসব কমিটির পক্ষ থেকে প্রসাদ ও পানির ব্যবস্থাও করা হয়।
স্নানোৎসবে অংশ নিতে আসা পূণ্যার্থী তপন চন্দ্র দাস বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারও পরিবার নিয়ে অষ্টমী স্নানে এসেছি। এখানে আসতে পারলে মনটা শান্তি পায়।”
অন্য এক পুণ্যার্থী পূজা রাণী বিশ্বাস জানান, “আমরা বিশ্বাস করি এই স্নানের মাধ্যমে পাপমুক্তি হয় এবং ঈশ্বরের কৃপা লাভ করা যায়। তাই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছুটে আসে।”
হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী নাহিদ ইভা বলেন, “পূর্ণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তি না হয়, সে বিষয়েও আমরা সতর্ক রয়েছি।”
অষ্টমী স্নান পরিদর্শনে এসে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “এ ধরনের ধর্মীয় উৎসব আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শান্তিপূর্ণভাবে উৎসব উদযাপনে প্রশাসন সর্বাত্মক সহযোগিতা করছে। ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।”