লাশবাহী ভ্যানচালক
শামীম আনোয়ার, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০২৬ ১৩:৩৩ পিএম
আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬ ১৩:৫৩ পিএম
ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানার লাশবহনকারী ভ্যানচালক আব্দুল বারেক। লাশ নিয়ে একাকী পথ পাড়ি দিচ্ছেন ময়মনসিংহ–কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে, গন্তব্য ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রাত হোক কিংবা দিন, ঝড়-বৃষ্টি বা কুয়াশা—ময়মনসিংহের গৌরীপুরে অস্বাভাবিক কোনো মৃত্যুর খবর এলেই একটি মানুষ নিঃশব্দে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তার নাম আব্দুল বারেক। থানার লোকজন থেকে শুরু করে স্থানীয় মানুষ—সবার কাছে তিনি পরিচিত ‘লাশের ভ্যানচালক’ হিসেবে।
কাঁটা-ছেঁড়া, পচাগলা কিংবা দুর্ঘটনায় ছিন্নভিন্ন দেহ—যে লাশের কাছে যেতে অনেকেই ভয় পান, সেই লাশই নিজের হাতে তুলে ভ্যানে তোলেন বারেক। নেই হাতে গ্লাভস, নেই মাস্ক। তীব্র দুর্গন্ধেও তার নাকে-মুখে রুমাল চাপতে দেখা যায় না। প্রায় ২৫ বছর ধরে এই কঠিন কাজই তার জীবিকা। এই সময়ে তিনি বহন করেছেন সহস্রাধিক লাশ।
অথচ একসময় নিজের শরীরের সামান্য রক্ত দেখলেও অজ্ঞান হয়ে যেতেন তিনি। জীবিকার প্রয়োজনে সেই ভয় আর দুর্বলতাকে পেছনে ফেলে আজ তিনি হয়ে উঠেছেন গৌরীপুর থানার ভরসার মানুষ।
লাশের খবরই যার জীবিকার খবর
গৌরীপুর শহরের ছয়গন্ডা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল বারেক। মৃত মফিজ উদ্দিনের ছেলে তিনি। বয়স এখন প্রায় ৬৫ বছর। দেড় শতাংশ জমির ওপর ছোট্ট একটি ঘরেই তার বসবাস। স্ত্রী আবেদা খাতুন, দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন নাতি-নাতনিসহ ছয়জনের সংসার তার।
সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস এই লাশ বহনের কাজ। বারেক জানান, পরিচয়হীন লাশ হলে ময়নাতদন্ত ও বহনের জন্য থানার পক্ষ থেকে তিন থেকে চার হাজার টাকা দেওয়া হয়। তবে ময়নাতদন্তের খরচসহ নানা খাতে প্রায় দুই হাজার টাকা চলে যায়। আর যদি মৃতের স্বজন থাকে, তখন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, “এই টাকা দিয়েই সংসার চালাই। সব মাস সমান যায় না। কোনো মাসে একটু ভালো, কোনো মাসে আবার খুব কষ্টে চলতে হয়।”
বারেকের দিন শুরু হয় এক ধরনের অপেক্ষা দিয়ে—কখন ফোন বাজবে, কখন থানায় খবর আসবে। কারণ সেই ফোন মানেই কোনো লাশ বহনের খবর, আর সেই খবরই তার সংসারের রোজগারের খবর।
ভয়হীন কাজ, তবু আছে কিছু স্মৃতি
এখন লাশ দেখে আর ভয় পান না বারেক। তবু কিছু অভিজ্ঞতা এখনও তাকে অস্থির করে তোলে।
এক রাতে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা সড়ক দিয়ে দুই ডাকাতের লাশ নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। চারদিকে কুয়াশা আর তীব্র শীত। হঠাৎ বেলতলী এলাকায় জঙ্গল থেকে এক ব্যক্তি দৌড়ে এসে ভ্যানের ওপর উঠে লাশের ওপর বসে পড়ে।
বারেক বলেন, “তখন বুঝতে পারছিলাম না—সে মানুষ না ভূত। শরীর কাঁপছিল ভয়েতে। পরে একটা দোকানের সামনে গিয়ে থামি। চা-বিস্কুট খাওয়ানোর পর বুঝলাম, লোকটা আসলে একজন পাগল।”
আরেকবার গভীর রাতে মনে হয়েছিল ভ্যানের ওপর রাখা লাশটি যেন নড়ে উঠেছে। পরে বুঝতে পারেন, নিজের শরীরের চাদর বাতাসে দুলে সেই অনুভূতি তৈরি হয়েছিল।
কঠিন কাজেও দায়িত্বে অটল
লাশ উদ্ধারের কাজে বারেকের দক্ষতার কথা স্বীকার করেন গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হাসান।
তিনি বলেন, অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে কেউ লাশের কাছে যেতে চায় না। তখন বারেকই এগিয়ে আসে। তার কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ সত্যিই প্রশংসনীয়।
একবার বলেশ্বর সেতুর নিচে একটি বিকৃত ও পচাগলা লাশ পড়ে ছিল। দুর্গন্ধে কেউ কাছে যেতে পারছিল না। চারপাশে শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ সাহস করেনি লাশটি তুলতে। তখন বারেক এসে কচুরিপানা সরিয়ে মুহূর্তেই লাশটি উদ্ধার করে পুলিশের ব্যাগে ভরে দেন বলেও জানান ওসি।
লাশ পাহারা দিতে গিয়েও ঘুম
বারেককে নিয়ে গৌরীপুরে নানা গল্প প্রচলিত আছে।
একবার সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন নিহত হওয়ার পর থানায় লাশ পাহারার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাকে। গভীর রাতে তিনি খাবার খেয়ে এসে লাশগুলোর পাশে সাদা কাপড় গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়েন।
রাতে ডিউটিতে থাকা কনস্টেবল এসে লাশ গুনে দেখেন—সংখ্যা আট! আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে কাপড় সরিয়ে দেখা যায়, অতিরিক্ত ‘লাশ’টি আসলে বারেক নিজেই।
বয়স বাড়লেও কমছে শক্তি
বছরের পর বছর ভ্যান টেনে লাশ বহন করতে করতে শরীর আজ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বারেকের। বয়সের ভারে আগের মতো শক্তি নেই। তবু সংসারের কথা ভেবে থামতে পারছেন না।
তিনি চান তার ভ্যানটিতে একটি মোটর লাগাতে। এতে অন্তত দূরের পথগুলো একটু সহজ হবে। কিন্তু প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার সেই মোটর কেনার সামর্থ্য তার নেই।
বারেক বলেন, “এই কাজ না করলে সংসার চলবে না। কিন্তু এখন শরীর আর আগের মতো নেই। যদি ভ্যানে একটা মোটর লাগাতে পারতাম, তাহলে একটু সুবিধা হতো।”
দিন শেষে ঘুমের মধ্যেও যেন লাশের ভ্যান ঠেলে চলেন তিনি। বয়স বাড়ছে, কমছে শরীরের শক্তি—কিন্তু আর্থিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তবু অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর এলেই, নিঃশব্দে নিজের ভ্যান নিয়ে রওনা দেন গৌরীপুরের সেই মানুষটি—লাশের ভ্যানচালক আব্দুল বারেক।