রামপাল ট্র্যাজেডি
বাগেরহাট প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২৬ ১১:৩৫ এএম
আপডেট : ১৩ মার্চ ২০২৬ ১৯:৪৪ পিএম
আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন শুক্রবার সকাল থেকেই নিহতদের বাড়িতে ভিড় করতে থাকেন। এক উঠানে একসঙ্গে এতগুলো লাশের এমন দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি অনেকেই। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
মোংলা পৌর শহরের সাত্তার লেনের একটি বাড়ি। ভোরের আলো ফোটার আগেই সেই বাড়ির উঠানজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে ৯টি লাশ। চারপাশে স্বজনদের বুকফাটা কান্না, প্রতিবেশীদের আহাজারি—শোক আর স্তব্ধতার এক ভারী আবহে যেন নিথর হয়ে আছে পুরো এলাকা।
ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পৌর বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকসহ তার পরিবারের সদস্যদের মরদেহ বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বাড়িতে পৌঁছায়। একসঙ্গে এতগুলো মরদেহ দেখে স্বজনরা কেউ কাঁদছেন, কেউ নির্বাক হয়ে বসে আছেন। অনেকেই আবার শোকে বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন।
আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় লোকজন শুক্রবার সকাল থেকেই নিহতদের বাড়িতে ভিড় করতে থাকেন। এক উঠানে একসঙ্গে এতগুলো লাশের এমন দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি অনেকেই।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুক্রবার জুমার নামাজের পর দুপুর ২টায় মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে পৌর কবরস্থানে তাদের দাফন করা হবে।

এর আগে বৃহস্পতিবার বাগেরহাটের রামপালে বেলাই ব্রিজ এলাকায় মাইক্রোবাস ও নৌবাহিনীর একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নববধুসহ ১৪ জন নিহত হন।
স্বজনদের দাবি, দুর্ঘটনায় নৌবাহিনীর বাস জড়িত থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কেউ এসে সমবেদনা জানায়নি। বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনায় নিহত নববধূ মার্জিয়া আক্তার মিতু, তার ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগমের মরদেহ বৃহস্পতিবার রাতেই খুলনার কয়রা উপজেলায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই তাদের দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে দুর্ঘটনায় নিহত মাইক্রোবাস চালক নাঈমের মরদেহ নেওয়া হয়েছে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সিঙ্গেরবুনিয়া গ্রামে। শুক্রবার বেলা ১১টায় সেখানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই হাসপাতাল থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন বর আহাদুর রহমান সাব্বির, তার বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী ও ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম। এছাড়া বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল এবং তাদের তিন সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরামও এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল হোসেন রনি বলেন, “রাজ্জাক ভাই আমাদের দলের একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন। ছেলের বিয়ে শেষে নববধূকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথেই এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। মোংলায় এর আগে একসঙ্গে এত মানুষের মৃত্যু আমরা দেখিনি।”
নিহত আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ভাই সাজ্জাদ সরদার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ভাইয়ের পরিবারের ১২ জনের মধ্যে ৯ জনই মারা গেছে। এখন বেঁচে আছে শুধু আমার ভাবী আর দুই ভাতিজা। একজন বাড়িতে আছে, আরেকজন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।”
বিয়ের আনন্দ, হাসি–আনন্দে মুখর পরিবেশকে ছাপিয়ে বাড়িটি এখন পরিণত হয়েছে শোকের বাড়িতে। উঠানজুড়ে সারিবদ্ধ লাশ আর স্বজনদের আহাজারি—এই দৃশ্য যেন পুরো মোংলাবাসীকেই গভীর শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।