ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, ময়মনসিংহ থেকে ফিরে
প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬ ০৯:২৩ এএম
আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪১ এএম
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি মৎস্য খাত। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি ও গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি মৎস্য খাত। নদীমাতৃক এ দেশে মাছ শুধু খাদ্যের উৎসই নয়, বরং লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নির্ভর করে মৎস্য উৎপাদন ও চাষাবাদের ওপর। গত কয়েক দশকে চাষভিত্তিক মাছ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাছের বিভিন্ন সংক্রামক রোগ। খামারভিত্তিক মাছ চাষে রোগের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন খামারিরা। এ পরিস্থিতিতে মাছের রোগ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ এবং টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে কাজ করছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)।
ময়মনসিংহে অবস্থিত এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে কৈ, পাঙাশ, পাবদা, গুলশা ও শিংসহ নানা প্রজাতির মাছের রোগ নির্ণয় ও প্রতিরোধে গবেষণা চালাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে পাঙাশ মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের উদ্যোগ।
মাছের রোগে বড় ক্ষতির মুখে খামারিরা
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ ও উত্তরাঞ্চলের অনেক এলাকায় পাঙাশসহ অন্যান্য চাষযোগ্য মাছের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত ও সংক্রামক রোগের প্রকোপ দেখা যায়। খামারের ঘন চাষব্যবস্থা, পানির গুণগত মানের অবনতি এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে এসব রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকদের মতে, বর্তমানে পাঙাশ মাছে উৎপাদনের অন্যতম বড় বাধা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। অনেক ক্ষেত্রে খামারে হঠাৎ করে ব্যাপক হারে মাছ মারা যায়, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘মড়ক’ বলা হয়। এতে একটি খামারের পুরো উৎপাদনই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
রোগ শনাক্তে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি
‘মড়কের’ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএফআরআই আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধ প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে। গবেষকরা রোগাক্রান্ত মাছ সংগ্রহ করে তাদের কিডনি, লিভার, ব্রেন ও প্লীহা থেকে নমুনা সংগ্রহের পর বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াল কালচার মিডিয়ায় পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের সুনির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারণ করেন। এর পাশাপাশি ‘চ্যালেঞ্জ টেস্ট’ নামে একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় কোন ব্যাকটেরিয়া প্রকৃতপক্ষে রোগের জন্য দায়ী। এসব তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী ধাপে ভ্যাকসিন উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
পাঙাশের জন্য ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের উদ্যোগ
বিএফআরআই ‘মিঠাপানির মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের আওতায় পাঙাশ মাছের জন্য একটি নিষ্ক্রিয় (ইনঅ্যাক্টিভেটেড) ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চলছে।
গবেষণায় রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া পৃথক করার পর সেগুলো ল্যাবরেটরিতে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপর ব্যাকটেরিয়াল কোষ পুনঃসাসপেন্ড ও সেন্ট্রিফিউজ করার মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় কোষ প্রস্তুত করা হয়। পরে এই কোষগুলো অ্যাডজুভ্যান্ট ও ন্যানোপার্টিকেলের সঙ্গে মিশিয়ে বিশেষ ধরনের ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়।
প্রথম ধাপে এই ভ্যাকসিন গবেষণাগারে এবং মাঠ পর্যায়ের হ্যাচারিতে ব্রুড পাঙাশ মাছের শরীরে ইনট্রাপেরিটোনিয়াল (আইপি) পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে ইমিউনাইজড ব্রুড মাছ থেকে উৎপাদিত পোনা রোগ প্রতিরোধে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষমতা নিয়ে জন্মায়।
মাঠপর্যায়ে পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল
ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যাচাইয়ে গবেষকরা মাঠপর্যায়ে বিস্তৃত পরীক্ষা চালান। ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের পাঁচটি খামারে ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত পোনা চাষ করা হয়। পরে এ মাছের খাদ্যের সঙ্গে ওরাল ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা হয়। নির্দিষ্ট সময় পর মাছের মিউকাস ও রক্তে অ্যান্টিবডির মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা যায়, রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে দেহে প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত পাঙাশ পোনার বেঁচে থাকার হার প্রায় ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে ভ্যাকসিন না দেওয়া পোনার বেঁচে থাকার হার ছিল মাত্র ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ে ভ্যাকসিনপ্রাপ্ত মাছে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের সংক্রমণ দেখা যায়নি।
সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গবেষণার অগ্রগতি
বিএফআরআই সূত্র জানায়, দেশের মৎস্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলেও এ খাতে বরাদ্দ এখনও সীমিত। বাজেট সংকটে অনেক সময় প্রয়োজনীয় গবেষণা সরঞ্জাম, আধুনিক ল্যাব সুবিধা এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ সম্ভব হয় না। পাশাপাশি প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্রে জনবল সংকটের কারণে গবেষণা কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বিএফআরআই গবেষকরা বিলুপ্তপ্রায় অনেক ছোট মাছের জাত পুনরুদ্ধারে সাফল্য অর্জন করেছেন।
মৎস্য গবেষক ড. মো. সিরাজুম মনির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘উন্মুক্ত জলাশয় থেকে বিলুপ্ত হতে চলা মাছ সংরক্ষণ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করে তা পুকুর বা আবদ্ধ জলাশয়ে চাষযোগ্য করে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’ তিনি আরও জানান, বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছ বাছাই করে গবেষণা করা হচ্ছে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে এসব প্রজাতির পোনা উৎপাদনে সাফল্য এসেছে এবং চাষাবাদের মাধ্যমেও সুফল পাওয়া গেছে। এ ধারাবাহিকতায় ময়মনসিংহে প্রধান কার্যালয় ছাড়াও বগুড়ার সান্তাহার, নীলফামারীর সৈয়দপুর ও যশোর উপকেন্দ্রে মিঠা পানির বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণে কাজ চলছে।
বর্তমানে ঢেলা, শোল, বাইম, রানি, কাজলি, বাতাসি, কাকিলা, কাওন ও ভোল মাছের প্রজনন এবং চাষপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে।
গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো হলে দেশের অর্থনীতিতে এর বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাবেক মৎস্য সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশে মৎস্য খাত এখন কৃষি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এ খাতে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো মানে শুধু মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।’ তার মতে, মাছের রোগ প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও ভ্যাকসিন উন্নয়নের মতো গবেষণা কার্যক্রমকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা : রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, এ সময়ে মৎস্য গবেষণা খাতে নতুন করে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক ল্যাব সুবিধা, পর্যাপ্ত বাজেট ও দক্ষ জনবল দিয়ে শক্তিশালী করা যায়, তবে বাংলাদেশের মৎস্য খাত আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে। পাঙাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ চাষযোগ্য মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন সফল হলে তা শুধু খামারিদের ক্ষতি কমাবে না, বরং উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্ভাবনাও বাড়াবে।