চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০২৬ ১০:১৩ এএম
কতিপয় টোকাই পাকড়াও। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে ঢাকঢোল পিটিয়ে পরিচালিত নজিরবিহীন অভিযানের শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত যৌথ বাহিনী ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে আলোচিত কোনো সন্ত্রাসীর নাম নেই।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযানের পর পুরো এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আপাতত এটিকেই তারা সফল হিসেবে দেখছে। তবে বাস্ততা এমন যে, আড়ম্বর করে চালানো এই অভিযানের সাফল্য যেন পর্বতের মূষিক প্রসব।
সোমবার ভোর থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের চার হাজার সদস্যের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র্যাব ও পুলিশের দুটি স্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি (উপ-মহাপুলিশ পরিদর্শক) আহসান হাবীব পলাশ। তিনি বলেন, জঙ্গল সলিমপুর এখন সম্পূর্ণ প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। এটি আমাদের পঞ্চম দফার প্রচেষ্টা, যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছে। এর আগে চার দফায় অভিযান চালানো হলেও ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে তা চ্যালেঞ্জিং ছিল।
শীর্ষ কোনো সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করতে না পারার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে অনেকে ইতোমধ্যে কারাগারে রয়েছে, অনেকে এখনও বাইরে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযানে প্রায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ বলেন, বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, তবে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের বিস্তারিত তালিকা এখনও প্রস্তুত হয়নি। এটি পরে জানানো হবে। ওই এলাকায় স্থায়ীভাবে একটি পুলিশ ও একটি র্যাব ক্যাম্প কার্যক্রম শুরু করবে। এছাড়া ঝুলে থাকা উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তিনি বিভাগীয় কমিশনারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
সোমবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য জঙ্গল সলিমপুরে ঢাকঢোল পিটিয়ে যৌথ অভিযান শুরু করে। দিনভর অভিযান নিয়ে মাতামাতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত সফলতার বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অভিযানের খবর পেয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো আগেই গা-ঢাকা দেয়। পালানোর সময় তারা খালের ওপরের সেতু ভেঙে, রাস্তায় ট্রাক আড়াআড়ি করে এবং ড্রেনের স্ল্যাব তুলে ব্যারিকেড তৈরি করেছিল। এছাড়া দুর্গম পাহাড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গতিবিধি নজরদারি করতে অপরাধীরা স্থাপন করা সক্রিয় সিসিটিভি নেটওয়ার্কের প্রমাণও অভিযান চলাকালীন পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সফল অভিযানে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সব বাধা দূর হয়েছে। এতদিন এখানে সরকারের কর্তৃত্ব নিয়ে যে সমস্যা ছিল, তা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার দিকে মনোযোগ থাকায় আমরা এখন এই বড় অভিযানটি পরিচালনা করেছি। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের পূর্বগৃহীত মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী এখন নিয়মিতভাবে উন্নয়ন কাজগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ১৫-২০ মিনিটের দূরত্বে বায়েজিদ লিংক রোডের উত্তর পাশে প্রায় ৩,১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। বর্তমানে এ এলাকায় প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। ২০২২ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এক বড় অভিযানের পর পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। সে সময় সরকার এ এলাকার উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে একটি মাস্টারপ্ল্যানও প্রণয়ন করে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইয়াছিন ও রোকন বাহিনী আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সর্বশেষ গত ১৯ জানুয়ারি এ এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। ওই বর্বরোচিত ঘটনার পর থেকেই সরকার এ এলাকায় বড় ধরনের অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।
জঙ্গল সলিমপুরকে কেন্দ্র করে সরকারের বিশাল পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর ও চমেক হাসপাতালের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ। আঞ্চলিক তথ্যকেন্দ্র এবং স্পোর্টস ভিলেজ প্রতিষ্ঠা। নাইট সাফারি পার্ক, বিনোদনকেন্দ্র এবং পরিকল্পিত বনায়ন। পাহাড়ের প্রকৃত ছিন্নমূল মানুষের পরিকল্পিত আবাসন ও পুনর্বাসন।