বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ০৭ মার্চ ২০২৬ ১৫:২৫ পিএম
মো. সাজু বদ্দি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
যশোরের শার্শা ও বেনাপোল সীমান্ত এলাকার মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অন্যতম হোতা হিসেবে পরিচিত মো. সাজু বদ্দিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
একাধিক মামলার এই আসামিকে শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তারের পর শার্শা থানায় নেওয়া হলে তার সমর্থকরা জড়ো হয়ে তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রাতেই তাকে কড়া নিরাপত্তায় যশোর জেলা সদরে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যশোরের শার্শা উপজেলার পাঁচভুলট গ্রামের বাসিন্দা মো. সাজু বদ্দির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিস্ফোরক, অস্ত্র, মাদক এবং সহিংসতার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি সীমান্ত এলাকার মাদক চক্র ও স্থানীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ ছিল। তবে নানা কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছিল না।
একাধিক গুরুতর মামলার আসামি
পুলিশের নথি অনুযায়ী, সাজু বদ্দির বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে শার্শা থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে তিনটি মামলা রয়েছে। ওই মামলাগুলোর এফআইআর নম্বর যথাক্রমে ৫৫/৪৯১ (৩১ অক্টোবর ২০১৮), ৩০/৪৬৬ (১৫ অক্টোবর ২০১৮) এবং ১৫/৪০৩ (৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮)। এ সব মামলায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর ধারা ১৫(৩) ও ২৫-ডি এবং ১৯০৮ সালের বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৪, ৫ ও ৬ ধারায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়।
এ ছাড়া ২০১৭ সালের ২২ মে শার্শা থানায় অস্ত্র আইনের ১৯(f)/১৯-৪ ধারায় দায়ের করা একটি মামলায়ও তিনি এজাহারভুক্ত আসামি। ২০১৪ সালে একই থানায় দণ্ডবিধির ৪৪৭, ৩২৩, ৩২৬, ৩০৭, ৪২৭ ও ৫০৬ ধারায় একটি এবং ৩২৬, ৩০৭ ও ৫০৬ ধারায় আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। এ সব মামলার প্রতিটিতেই সাজু বদ্দির নাম এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, এ সব মামলার বেশিরভাগই সহিংসতা, বিস্ফোরক ব্যবহার এবং অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত।
আগেও গ্রেফতার হয়েছিল
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২২ মে পাঁচভুলট গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে তাকে অস্ত্র আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে পরে তিনি জামিনে বেরিয়ে আবারও এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “সাজুর নাম শুনলেই মানুষ ভয় পেত। এলাকায় তার প্রভাব ছিল। অনেক সময় মানুষ প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস করত না।”
মাদক মামলাতেও জড়িত থাকার অভিযোগ
পুলিশি নথিতে দেখা গেছে, সাজু বদ্দির নাম মাদকসংক্রান্ত মামলাতেও এসেছে। ২০১৯ সালের ৪ জুলাই শার্শা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮-এর ৩৬(১) ধারায় দায়ের করা একটি মামলায় তাকে অভিযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর বেনাপোল পোর্ট থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার ৩(খ) অনুযায়ী দায়ের করা আরেকটি মামলাতেও তার নাম রয়েছে। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারের পর থানায় উত্তেজনা
সাম্প্রতিক অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাজু বদ্দিকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। তবে গ্রেপ্তারের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তার সমর্থক ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন থানার সামনে জড়ো হয়ে পড়ে বলে জানা গেছে।
পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, একপর্যায়ে উত্তেজিত কয়েকজন তাকে জোর করে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নিরাপত্তার স্বার্থে তাকে যশোরে স্থানান্তর করা হয়।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গ্রেপ্তারের পর কিছু লোক থানায় ভিড় করেছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছি”।
এলাকায় স্বস্তির নিশ্বাস
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকায় মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে আতঙ্ক ছিল। সাজু বদ্দিকে আটক করার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে।
পাঁচভুলট গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, “অনেক দিন ধরেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনে আসছি। এখন তাকে আটক করায় মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে”।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সীমান্ত এলাকায় মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তারা জানিয়েছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, “সাজু বদ্দির বিরুদ্ধে থাকা বিভিন্ন মামলার অগ্রগতি এবং তার অপরাধচক্রের সম্ভাব্য অন্যান্য সদস্যদের বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে”।