× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মিঠাপুকুর থানা

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের আড়ালে ‘ঘুষের রাজত্ব’

মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:৩৮ পিএম

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৬ ১৬:০২ পিএম

মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুজ্জামান । ছবি: সংগৃহীত

মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুজ্জামান । ছবি: সংগৃহীত

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের আড়ালে ঘুষ ও জুয়ার রাজত্ব কায়েমের অভিযোগ উঠেছে রংপুরের মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, মিঠাপুকুর থানায় থানায় মামলা করতে কোনও টাকা লাগে না- এমন প্রচার চালালেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র। ওসি মো. নুরুজ্জামানের ছত্রছায়ায় উপজেলায় মাদক, জুয়া আর ঘুষের মহোৎসব চলছে। গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী ঘুষের সিন্ডিকেট। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে , গত বছরের ১১ ডিসেম্বর যোগদানের পর থেকেই মিঠাপুকুর থানায় মামলা রেকর্ড করা সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মামলা রেকর্ড করতে গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। টাকা না দিলে অভিযোগ পড়ে থাকে দিনের পর দিন।

মিঠাপুকুর থানা সূত্রে জানা যায়, ওসি নুরুজ্জামান থানায় যোগদানের পূর্বে প্রতিমাসে ৬৫ থেকে ৭০টি মামলা রেকর্ড করা হতো। নুরুজ্জামান ওসি হিসেবে যোগদানের পরে গত বছরের ডিসেম্বর ২৩টি মামলা রেকর্ডভুক্ত করা হয়, জানুয়ারিতে করা হয় ৩০টি মামলা, ফেব্রুয়ারিতে করা হয় ২৯টি মামলা। 

সাইদুল ইসলাম নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, “জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় আমার স্ত্রী গুরুত্বর আহত হন। পরে থানায় অভিযোগ দেই। অভিযোগ দেওয়ার পরের দিন এক এসআই ঘটনাস্থলে আসে। সেখানে ওই এসআই আমাদের পক্ষেই প্রতিবেদন দেন ওসিকে। ৭ দিন পর ওসি আমাকে তার চেম্বারে ডেকে নিয়ে বিস্তারিত শোনেন এবং মামলা নথিভুক্ত করার কথা বলেন। কিন্তু ৮ দিন পরেই আবারো অন‍্য এক এসআইকে আমার বাড়িতে পাঠান ওসি। পরে জানতে পারি আমার মামলাটি এখনও হয়নি। ওই এসআই আমার কাছে থেকে ঘটনাটি আবারো শুনেন এবং ওসিকে প্রতিবেদন দেন। ওসি পরের দিন সন্ধ্যায় আবারো তার চেম্বারে ডেকে নেন। ওসি বলেন, মামলায় তো খরচ আছে আমার এসআইয়ের বিষয়টি একটু দেখবেন। পরে আমি আশ্বাস দিলে ১০ দিনের মাথায় মামলাটি হয়েছে এবং আসামি না ধরে বিবাদী পক্ষকে জামিনে বের হয়ে আসার সুযোগ করে দিয়েছে।”

মিঠাপুকুর থানায় হঠাৎ মামলা কমে যাওয়া ও ঘুষ ছাড়া মামলা রেকর্ড হয় না- এমন অভিযোগের বিষয়ে ওসি নুরুজ্জামান বলেন, “পূর্বে থানায় মাসে ৬৫/৭০টি মামলা রেকর্ড হতো। যার অধিকাংশ মিথ্যা মামলা ছিল। আমি আসার পরে সত্যতার ভিত্তিতে মামলা রেকর্ড করায় মামলার সংখ্যা কমেছে। এসআইদের মাধ্যমে প্রত্যেক মামলায় ঘুষ নেওয়া এবং এসআইদের বিষয়ে একটু দেখার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোনও ভুক্তভোগীকে এমন কথা বলি নাই আর কোন এসআইকে ভুক্তভোগীরা টাকা দিছে, তাদের কাছে নাম শুনুন।”

এদিকে যোগদানের পর মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছিলেন ওসি নুরুজ্জামান। অথচ বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে মাদক কারবারি ও জুয়াড়িরা। অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার বলদিপুকুর নয়াটাড়ি হিন্দুপাড়ায় গত দেড় মাস থেকে প্রকাশ্যে জুয়ার আসর চলছিল। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ওসিকে কয়েকদফা অভিযোগ দেওয়ার পরেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় গত বৃহস্পতিবার দুইটি মোটরসাইকেল, নগদ অর্থ ও জুয়ার সরঞ্জামসহ একজনকে আটক করে পুলিশে দেয়। পুলিশ মোটরসাইকেল জব্দ করলেও মামলা না করে আটক ব্যক্তিকে মুচলেকা নিয়ে ঘটনাস্থলেই ছেড়ে দেয় পুলিশ।

স্থানীয় শাহ আলম নামে এক ব‍্যক্তি বলেন, “জুয়ার বোর্ডের সরঞ্জামসহ এলাকাবাসী আটক করার পরে ওসিকে আমি ঘটনাস্থলের ভিডিও ডকুমেন্টস পাঠাই। ওসি সেটা আবার জুয়ার বোর্ডের স্বত্বাধিকারীকে নাম ধরে বলে দেয় যে, অমুক আমাকে আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিছে, ভিডিও দিছে। এরপরেই আবার অপরাধী আমাকে কল দিয়ে বলে আপনি নাকি ওসিকে ভিডিও দিয়েছেন, কল দিয়েছিলেন।”

তিনি বলেন, “ওসি এই জুয়ার পয়েন্ট থেকে পুটু চেয়ারম্যান, রাসেল মেম্বার ও বাবু মেম্বারের মধ্যস্থতায় বিট অফিসারের মাধ্যমে নিয়মিত মাসোহারা পেতেন জন্যই জুয়ার সরঞ্জাম ও নগদ অর্থসহ আটকের পরেও মামলা না নিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।”

এদিকে বিষয়টি জানতে পুটু চ‍েয়ারম‍্যানকে মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করেও পাওয়া যায়নি। তবে রাসেল মেম্বার এবং বাবু মেম্বার জানান, “আমাদের এই অবৈধ জুয়ার সাথে কোনও সম্পৃক্ততা নেই। এটি ওসি নিজেই জুয়ার বোর্ডের স্বত্বাধিকারীর সাথে হ‍্যান্ডেল করতেন। আমরাও শুনেছি ওসির অনুমতি এবং মোটা অংকের টাকা লেনদেনের মাধ‍্যমে এটি চলেছে।”

এই অভিযোগের বিষয়ে ওসি নুরুজ্জামান বলেন, “আমি যদি জুয়ার বোর্ড থেকে টাকা নিতাম তাহলে ওই স্পট থেকে দুইটি মোটরসাইকেল জব্দ করে থানায় আনতাম না।”

এছাড়া রাতে উপজেলার ফুলবাড়ি রোডে অবৈধ বালু বহনকারী ড্রাম ট্রাকগুলো থেকে নিয়মিত একটি বড় অংকের টাকা ওসির পকেটে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশ‍্যে অনিচ্ছুক কয়েকজন চালক জানিয়েছেন, রাতের আধারে বালুবহনকারী গাড়ি থামিয়ে থানার টহল গাড়ির পুলিশেরা ‘টাকা লেনদেন’ করে। তাদের নাকি ওসি স‍্যার পাঠিয়েছেন। এ বিষয়ে ওসি নুরুজ্জামান বলেন, “বালু সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ইউএনও এসিল্যান্ডের বিষয়। এটা আমার এখতিয়ারের বাইরে। এটি ভিত্তিহীন অভিযোগ।”

স্থানীয় একাধিক সংবাদকর্মীর সাথে অসদাচরণ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এবং থানায় আসতে নিষেধ করার অভিযোগও উঠেছে ওসির বিরুদ্ধে।

রোকনুজ্জামান নামে স্থানীয় এক গণমাধ‍্যমকর্মী বলেন, “আমার চাচার পারিবারিক ঝামেলা সমাধানের জন্য চাচাকে সাথে নিয়ে থানায় একটি অভিযোগ করতে গিয়েছিলাম। অভিযোগ জমা দিয়ে ফেরার পথে ওসি নুরুজ্জামান আমাকে আটক করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন এবং মিঠাপুকুর থানায় সাংবাদিক প্রবেশ নিষিদ্ধ বলে জানিয়ে দেন।”

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি নুরুজ্জামান বলেন, “আমি কোনও গণমাধ্যমকর্মীকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করিনি। যারা মামলা মোকদ্দমা রেকর্ড করার জন্য দালালি করে মানুষের কাছে টাকা পয়সা নেয়। তাদেরকে এই কথা বলতে পারি। আমাকেতো আপনি প্রশ্ন করেছেন। আমিতো আপনাকে থানায় আসতে নিষেধ করছি না।”

মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মো. নুরুজ্জামান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি কোনো ভুক্তভোগীর কাছে টাকা নিয়ে থাকেন। সেটাতো আমি জানবে না। তারপরেও মামলা হওয়ার পরে আমি বাদীকে কল দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করি তারা মামলা করার জন্য কাউকে কোনো টাকা পয়সা দিয়েছেন কি না। যাতে পুলিশের নাম করে কেউ টাকা নিতে না পারে।”

এ বিষয়ে রংপুর পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইনের মুঠোফোনে করলে ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা