রংপুর-৩ আসন
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৭ এএম
নির্বাচনি প্রচারে আনোয়ারা ইসলাম রানী। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
রংপুর সদর উপজেলার লাহিড়ীর হাটে চায়ের দোকানে চলছে নির্বাচনি গল্প। গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধ মিলে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন আর চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন প্রার্থীদের নিয়ে সিটি করপোরেশন ও সদরের ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে কে হবেন সংসদ সদস্য। কেউ বলছেন এলাকার ছাওয়া লাঙ্গলের কাদের হোক এমপি, কেউ বলছেন ধানের শীষের সামুর দল নাকি সরকার গঠন করবে, ওমাকে দেওয়া হোক। কেউ বলছেন, নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল তো ম্যালা দেখনু এইবার দাঁড়িপাল্লা দেখি। কেউ বলছেন হাতপাখার পিয়ালও তো ভালো মানুষ। চায়ের দোকানে থাকা কৃষক আমিনুর রহমান বলেন, এইবার হামরা হিজরাক ভোট দিয়া দেখি। ওয় কয়েকবার থ্যাকি ভোটোত দাঁড়ায়। গেলবার কাদেরের কাছাকাছি ভোট পাইছিল। বাড়িসুদ্ধায় ওমাকে এইবার ভোট দেমো। তার কথা শুনে দোকানে থাকা কয়েকজন বলে ওঠেন, ঠিক ঠিক।
সাতমাথা এলাকার সাউন্ড ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, এবারও তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী নির্বাচন করছেন। এ নির্বাচনে লিঙ্গ কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। যেহেতু তিনি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের কষ্ট তিনি বোঝেন। এ ছাড়া তার জীবনে কোনো পিছুটানও নেই। সর্বোপরি তিনি একজন ভালো মানুষ। আমরা চাই তার মতো পরিচ্ছন্ন মানুষ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হোক।
রংপুর নগরীর আলমনগরের বাসিন্দা আবু সাঈদ বলেন, রানী আপা তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীসহ সাধারণ মানুষের পাশে সব সময় ছিলেন। তার জনগোষ্ঠীর মানুষ সড়ক দুর্ঘটনা আহতসহ গ্রামের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কাজসহ নানা ধরনের সামাজিক কাজ করেছে। তাই আগামী নির্বাচনে রানী আপার জন্য আমরা দোয়া করছি। তিনি যেন জনপ্রতিনিধি হয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন।
জানা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী। ওই নির্বাচনে হেভিওয়েট প্রার্থী জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের জয়লাভ করলেও তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হন রানী। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৫ লাখ ভোটার হলেও ভোট প্রদান করেছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯ জন। এর মধ্যে ৮১ হাজার ৮৬১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের। অপরদিকে রানী পেয়েছিলেন ২৩ হাজার ৩২৬ ভোট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও রংপুর-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে নেমেছেন আনোয়ারা ইসলাম রানী।
আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, হরিণ প্রতীক পেয়ে আমি অত্যন্ত খুশি। হরিণ হচ্ছে সততা, সুন্দর ও নিরীহতার প্রতীক। আদিবাসী, দলিত, হরিজন, সনাতনী, বেদে, প্রতিবন্ধীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আমার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। আমি নির্বাচিত হয়ে সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করতে চাই। এ ছাড়া রংপুর অনেক অবহেলিত। আমি অবহেলিত রংপুরের উন্নয়নে কাজ করে যাব।
তিনি বলেন, আমার শক্তি হচ্ছে রংপুর-৩ আসনবাসী। তারা আমাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনে ও জানে। গত নির্বাচনে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থনে আমি অভিভূত। তাদের ভালোবাসার কারণে আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। সদরবাসী জানে আমার স্বামী নেই, সংসার নেই। আমি আমার জীবন উৎসর্গ করেছি পিছিয়ে থাকা, অবহেলিত মানুষের উন্নয়নের জন্য। তাই গত নির্বাচনের মতো তারা আমাকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করবে বলে প্রত্যাশা করছি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জমা দেয়া হলফনামা সূত্রে জানা যায়, তৃতীয় লিঙ্গের আনোয়ারা ইসলাম রানী নগরীর নূরপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি অষ্টম শ্রেণি পাস ও পেশায় একজন ব্যবসায়ী।
উল্লেখ্য, রংপুর-৩ (সদর ও সিটি করেপোরেশন) আসনে আনোয়ারা ইসলাম রানী (হরিণ) ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টির জিএম কাদের (লাঙ্গল), বিএনপির সামসুজ্জামান সামু (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলনের আমিরুজ্জামান পিয়াল (হাতপাখা), জামায়াতে ইসলামীর মাহাবুবুর রহমান বেলাল (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের আব্দুল কুদ্দুস (মই), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মাকর্সবাদী) আনোয়ারা হোসেন বাবলু (কাঁচি) ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য স্বতন্ত্র প্রার্থী রিটা রহমান (সূর্যমুখী)।