গোফরান পলাশ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:১৫ পিএম
কুয়াকাটা সৈকতে ভেসে আসা মৃত জেলিফিশ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে অস্বাভাবিকভাবে ভেসে আসছে অসংখ্য মৃত জেলিফিশ। গত কয়েক দিন ধরে সৈকতের লেম্বুরবন, মাঝিবাড়ি, গঙ্গামতি ও ঝাউবাগানসহ বিভিন্ন পয়েন্টে স্বচ্ছ মৃত জেলিফিশ ভেসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। কখনো জোয়ারের পানিতে ভেসে আসছে, আবার কখনো বালিতে আটকে নিথর হয়ে পড়ছে এসব জেলিফিশ। তবে সৈকতের এ চিত্রের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা গভীর সমুদ্রে বলে জানিয়েছেন জেলেরা।
জেলেদের ভাষ্য, সাগরে মাছ ধরার জালে হাজার হাজার জেলিফিশ আটকে পড়ায় জাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং মাছ ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এতে বাধ্য হয়ে অনেক জেলে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছেন। ফলে চরম লোকসান ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
হোসেনপাড়া এলাকার জেলে মো. মাহাতাব আকন বলেন, “প্রতিদিন সাগরে গেলে জালে মাছের চেয়ে জেলিফিশই বেশি উঠছে। জাল পরিষ্কার করতেই সময় চলে যাচ্ছে, মাছ ধরা সম্ভব হচ্ছে না। সংসার চালানো নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি”।
ঝাউবন এলাকার জেলে মো. শামিম হোসেন জানান, “প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিলে কিছু জেলিফিশ আসে। কিন্তু এবার দুই সপ্তাহ আগেই সাগর ভরে গেছে। এমন অবস্থা আগে কখনো দেখিনি। এখন সাগরে গেলে শুধু ক্ষতিই হচ্ছে”।
গবেষকদের মতে, জেলিফিশ সমুদ্রের একটি প্রাকৃতিক প্রাণী এবং সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জেলিফিশ মূলত অতিক্ষুদ্র প্ল্যাংকটন খেয়ে বেঁচে থাকে এবং নিজে কচ্ছপ, কিছু মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষ করে সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রধান খাদ্যের একটি হলো জেলিফিশ। তবে কচ্ছপসহ জেলিফিশভোজী প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় জেলিফিশের বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। পাশাপাশি সাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অক্সিজেনের ঘাটতি এবং দূষণ জেলিফিশের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে সহায়তা করছে।
গবেষকরা আরও বলছেন, জেলিফিশের আধিক্য অনেক সময় সমুদ্রের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার একটি সতর্ক সংকেত হিসেবেও বিবেচিত হয়।
বিষয়টি নজরে এসেছে সমুদ্র অর্থনীতি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইকোফিশ’-এর। প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী গবেষক মো. বখতিয়ার হোসেন জানিয়েছেন, তারা মৃত জেলিফিশের নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে গবেষণা চলছে।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা)-এর যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু বলেন, “জেলিফিশের আক্রমণের পাশাপাশি বছরের বিভিন্ন সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৈরী আবহাওয়া এবং বছরে দুই দফা মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার কারণে উপকূলীয় জেলেরা এমনিতেই চরম সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এতে তাদের জীবন-জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
বর্তমান এই কঠিন পরিস্থিতিতে উপকূলীয় জেলেদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও কার্যকর নজরদারি ও সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন”।
একই সঙ্গে গবেষকদের সম্পৃক্ত করে জেলিফিশসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে গভীর গবেষণার মাধ্যমে জেলেদের ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, “প্রতিবছরই নির্দিষ্ট সময়ে জেলিফিশ তীরে আসে। সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যেই এ সমস্যা প্রাকৃতিকভাবে কমে যায়”।