মোহসীন হোসেন মোল্লা (বাকেরগঞ্জ) বরিশাল
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৫:২১ পিএম
শুষ্ক মৌসুমকে সামনে রেখে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার মৃৎশিল্পীরা এখন পার করছেন ব্যস্ত সময়। মাটির তৈরি নানা তৈজসপত্র ও খেলনার চাহিদা বাড়ায় উপজেলার কুমারপাড়া ও পালপাড়ায় চলছে কর্মযজ্ঞ। তবে প্লাস্টিক ও পলিথিনের দাপটে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ সংকটের মুখে। শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে শিল্পীরা পলিথিন ও প্লাস্টিক বন্ধ এবং সরকারের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দাবি করেছেন।
ঐতিহ্যবাহী পালপাড়ায় উৎপাদনের উৎসব
উপজেলার কলসকাঠী ইউনিয়নের কুমারপাড়া এবং নিয়ামতি ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামে প্রায় দুই শতাধিক পরিবার বংশপরম্পরায় এই মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। শুকনো মৌসুমকে ঘিরে এই গ্রামগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ। তৈরি হচ্ছে—হাঁড়ি, কড়াই, ব্যাংক, বাসন, থালা, বাটি, কলস, ঘটি, মুড়িভাজার ঝাঞ্জুর, চুলা এবং নানা রকমের পুতুল, ফুলদানি, হাতি, ঘোড়া, বাঘ, টিয়া, ময়না, ময়ূরসহ বাহারি মাটির জিনিসপত্র।
সরেজমিনে কলসকাঠী ও নিয়ামতি ইউনিয়নের পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মৃৎশিল্পী সুশীল পাল, শিবু পাল, গৌতম পাল, রূপক পাল, শ্যাম পাল, কার্তিক পাল, সুমন পাল, নিপু পাল, দীপক পাল, অশোক পাল, নয়ন পাল, নৃপেন্দ্র চন্দ্র পাল, ফনীন্দ্র চন্দ্র পাল, দেবেন্দ্র চন্দ্র পালসহ অনেকেই মাটি প্রস্তুত করা, সাঁচ বসানো, চুলায় পোড়ানো, রোদে শুকানো এবং রঙের কাজে ব্যস্ত। প্রায় দুই শতাধিক পরিবারের মধ্যে ৫০ জনেরও বেশি নারী এই শিল্পের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত।
প্লাস্টিকের আগ্রাসন ও জীবনধারণের সংগ্রাম
তবে এই উৎপাদনশীলতার মাঝেও মৃৎশিল্পীদের কদর কমে যাচ্ছে দিন দিন, হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী পণ্য। মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় এই শিল্পের ব্যাপক কদর থাকলেও বর্তমানে বছরের বেশিরভাগ সময় তা থাকে না। শুধু শুষ্ক মৌসুম এবং বিভিন্ন মেলা এলেই চিরচেনা এই পালপাড়া কর্মমুখর হয়ে ওঠে।
মৃৎশিল্পী গৌতম পাল বলেন, "আমাদের বংশানুক্রমে এই পেশা চলে আসছে। কিন্তু প্লাস্টিক ও পলিথিনের কারণে মাটির জিনিসের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। এই শিল্প দিয়ে সংসার চালাতে অনেক কষ্ট হয়। মৃৎশিল্পকে বাঁচাতে হলে পলিথিন ও প্লাস্টিক বন্ধ করা অত্যাবশ্যক।"
আরেক শিল্পী স্বপন কুমার পাল জানান, মূলধনের অভাবে তাদের তৈরি পণ্য কম দামে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, সংকর চন্দ্র পাল নামের এক শিল্পী আক্ষেপ করে বলেন, "আমাদের সন্তানেরা মাটির কাজ শিখতে চায় না, তারা অন্য পেশায় যাচ্ছে। অন্য কাজ না জানার কারণে আমরা কোনোমতে টিকে আছি। আমাদের খোঁজখবর কেউ নেয় না।"
মৃৎশিল্পীরা মনে করেন, সরকারি সাহায্য, পৃষ্ঠপোষকতা, এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ পেলে খেলনা, শোপিসসহ অন্যান্য শৌখিন জিনিস তৈরি করে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন শতবর্ষী একটি ঐতিহ্য রক্ষা পাবে, তেমনি অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিরও চাকা সচল হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, "আমাদের মৃৎশিল্পীরা কেবল কারিগর নন, তাঁরা আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। আমরা সরেজমিনে তাঁদের জীবনযাত্রা ও শিল্পকর্ম পর্যবেক্ষণ করেছি এবং দেখেছি এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আজ কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মৃৎশিল্পীদের পাশে উপজেলা প্রশাসন থাকবে।"
মৃৎশিল্পীদের দাবি—প্লাস্টিক ও পলিথিন বন্ধ করে এই শিল্পকে রক্ষা করতে দ্রুত সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।